অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দুই পক্ষের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসন্ন শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এই চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও তা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তিনি দাবি করেছেন, এই প্রাথমিক চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং পরের ধাপে দুই পক্ষের মধ্যে আরও ব্যাপক আলোচনা এগিয়ে যাবে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া এক সংবাদবিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ইরানি জনগণের একজীবন অবস্থানের ফলে প্রতিপক্ষকে পিছু হটতে হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বহরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সমঝোতা শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল; বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী গতিতে বাধা পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বড় অগ্রগতি হয়েছে—তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ১৯ জুন খসড়া সমঝোতে আনুষ্ঠানিক সম্মতি হওয়া পর দুই পক্ষ পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি শেষ করার লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবে।
খসড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে: হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেয়া—এর আগে প্রণালী থেকে লুকানো মাইন অপসারণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রণালী স্বাভাবিকভাবে চালু হলে ইরানের উপরে দীর্ঘ সময় ধরে জারি থাকা মার্কিন নৌ-অবরোধও প্রত্যাহার করা হবে এবং তেল পরিবহন পুনরায় শুরু হবে। বিশ্বসমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়; ফলে এটি চালু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সরাসরি স্বস্তি আসবে।
অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তি হওয়া পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইরানের ওপর থাকা তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞাও সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হবে, যাতে তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করে রাজস্ব অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে কিছু আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার ধাপে ধাপে মুক্তি দিয়ে ইরানকে ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে—এগুলো নগদ তহবিল স্থানান্তর, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বিশেষ আর্থিক ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে দেওয়া হতে পারে।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরান স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা তা অর্জনের চেষ্টা করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের বর্তমান পরমাণু কর্মসূচি বজায় রাখবে—অর্থাৎ নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা হবে না এবং স্থাপনাগুলোর পরিধিও বাড়ানো হবে না।
সমঝোতা অনাদের খবর ছড়ানোতেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পুঁজিবাজারে প্রতিক্রিয়া এসেছে। খবর প্রকাশের পরই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩.৬৫ ডলার (প্রায় ৪.২%) কমে ৮৩.৬৮ ডলারে নেমে আসে। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও প্রায় ৪.৯% কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০.৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মত, হরমুজ প্রণালী খুলে গেলে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারে চাপ কমে মূল্য স্থিতিশীল হওয়া সম্ভব।
শেয়ারবাজারেও সংবাদের ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ৫.৫% বেড়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক প্রায় ৫.৭% ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া এবং হংকংয়ের বাজারেও ইতিবাচক রকমের প্রভাব পড়েছে। মার্কিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসদাকের ফিউচার লেনদেনেও আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা গেছে।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারেও প্রভাব পড়েছে; মার্কিন ডলার বিপরীতে অন্যান্য প্রধান মুদ্রা শক্তিশালী হয়েছে, যার ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কিছুটা কমার আশা করা হচ্ছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেছে, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর সম্ভাবনা একযোগে তেলের দাম ও ডলারের মান—দুটোই নিচের দিকে টেনে এনেছে, যা মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করান যে এটি এখনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়; প্রাথমিক স্মারকের পরে দুই পক্ষের মধ্যে কড়াকড়িভাবে আলোচনা ও যাচাই-বাছাই চলবে। সাম্প্রতিক উন্নয়ন কূটনৈতিকভাবে তাত্পর্যপূর্ণ হলেও স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য আগামী দিনের আলোচনা এবং বাস্তব পদক্ষেপই চূড়ান্ত নির্ধারণ করবে।














