কিশোরগঞ্জে টানা অতিবৃষ্টিতে ও নদী-নালা ভরাটের ফলে বহুবছর ধরে হাওরাঞ্চল ভিজে শত শত একর জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কৃষক ভাসমান ধান কেটে নিচ্ছেন, আবার অনেক ক্ষেতেই ফসল সম্পূর্ণ নষ্টের মুখে পড়েছে। যে ধান কয়েক দিনের মধ্যে ঘরে তোলা ছিল, তা এখন বৃষ্টিজল ও উজানের পানিতে ডুবে দুর্বিষহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
কলিমপুর, ছিলনী, কাকটেংগু সহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা জানান, হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে নেমে ধান কাটা ও মোড়ানোর কষ্ট সইতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই হার্ভেস্টার নামানোর সম্ভাবনা নেই। ফলে শ্রমিক দিয়েই কষ্ট করে ধান কাটতে হচ্ছে, যা উৎপাদনখরচ কয়েকগুণ বাড়িয়েছে। বাজারে ভেজা ধানের চাহিদা কম হওয়ায় বিক্রিও ঝুঁকিতে পড়েছে।
কলিমপুর গ্রামের ইকবাল হোসেন বললেন, ‘‘কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি এবং উজানের পানিতে আমাদের হাওরের বেশিরভাগ জমির ধান তলিয়ে গেছে। জমিতে পানি জমে থাকায় হার্ভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছেনা, শ্রমিক বাড়াতে হচ্ছে—সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে।’’
হযরত আলী আরও বলেন, ‘‘উজানের পানি নামলেই হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। শিবপুরের খোয়াই নদী ভরাট হওয়ার কারণে প্রতিবারই এই জলাবদ্ধতা হয়। এতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ে, মজুরি বাড়ে।’’
কৃষক কামরুল ইসলামের উদ্বেগও কম নয়। তিনি জানান, ‘‘ফসল ভালো হয়েছে, কিন্তু সব পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন কীভাবে ঋণ শোধ করবো—এই চিন্তায় দিন কাটে। সার-কমপোস্ট, কীটনাশক ও বাড়তি শ্রম ও পরিবহনের খরচ যোগ হয়েছে, ফলে লোকসান আরও বেড়েছে।’’
স্থানীয় বেলাল ভূঁইয়ার অভিযোগ, খোয়াই নদীর ভরাটই এ ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মূল কারণ। তিনি বলেন, ‘‘আগেই প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল, কিন্তু এখনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’’
আলাদা আলাদা বাড়ি-পরিবারের জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে—রতন মিয়া বলেন, ‘‘ঋণ নিয়ে ১০ একর জমি চাষ করেছিলাম, কিন্তু ধান কাটতেই পারছি না। এখন পরিবারের মুখে কী খাব ও ঋণ কীভাবে শোধ করবো—ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছি না।’’ অন্য কৃষক এংরাজ মিয়া বলেন, ‘‘পুরো ফসল পানির নিচে; পচে যাওয়া ধানও কেটে নিতে হচ্ছে, না হলে আর কিছুই থাকত না।’’
ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের হারুন অর রশিদ জানান, পাশ্ববর্তী কাকটেংগুর হাওরেও পানি ঢুকেছে, অনেক জমির ধান এখনও কাটা হয়নি, ফলে তাদের আশা প্রায় শেষ। কাকটেংগুর গ্রামের ফেরদৌস মিয়া বলেন, ‘‘সারাবছরের খাদ্যের জন্য এক একর জমিতে চাষ করেছি, হঠাৎ পানি বাড়ায় সব তলিয়ে গেছে। ঋণের বোঝা আর সংসারের চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছি।’’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে সম্পূর্ণ ক্ষতির পরিমাণ বলা সম্ভব না। দ্রুত দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। তিনি জানালেন, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে যাদের মধ্যে হাওরাঞ্চল প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে; প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধান কাটা ধীরগতিতে হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, হাওরের পানি এখনও বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়নি, তবে টানা বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। আগাম বন্যার ঝুঁকি এড়াতে এবং পাকা ধান রক্ষা করার লক্ষ্যে তিনি ৮০ শতাংশ পাকলেই ধান কেটে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি কৃষকদের দ্রুত ন্যায্য মূল্য ও বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় সতর্কতা-barrier নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন।
কৃষকেরাও প্রশাসনের ত্বরিত ব্যবস্থা ও নদ-নালা খনন, ভরাট অপসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানাচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ধানভর্তি ক্ষতি কমানো যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা না হলে ছোট ও মধ্যবিত্ত কৃষকের জীবিকা পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।














