আষাঢ়ের ভারী বর্ষা এবার দুই মেগাসিটিকে—ঢাকা ও চট্টগ্রাম—নেই ছাড়া এক ভয়াবহ পরীক্ষায় ফেল করেছে। সামান্য সময়ে নামানো বর্ষা ঠিক মতো নিষ্কাশন না হওয়ায় রাজধানীসহ বহু নগর এলাকা রাতের অন্ধকারে পানিতে ভাসছে, আর একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের সঙ্গে মিলেই বন্যা একটি জাতীয় সংকটে রূপ নেয়। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত 51 জনের মৃতু্যু এবং 39 জন জখম হয়েছেন।
ঢাকা: আধুনিক শহরের নীচে জমছে পানি
ঢাকায় শনিবার রাত 12টা থেকে রোববার সকাল 6টা পর্যন্ত 76 মিমি, সকাল 6টা থেকে দুপুর 12টা পর্যন্ত 82 মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের 24 ঘণ্টায়ও ঢাকায় 98 মিমি বৃষ্টি হয়েছিল। অল্প সময়ে এই অপরিসীম পানি নগরীর ড্রেনেজ সিস্টেম সামলাতে ব্যর্থ হওয়ায় গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর (কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর)সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকা দ্রুত জলমগ্ন হয়েছে। ফুটপাত তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্রধান সড়ক ব্যবহার করছেন; রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি ভোগান্তিতে পড়ে জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেও জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষা ব্যাহত
জলাবদ্ধতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিশুরা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর। সকাল থেকে অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে বের হতে পারেনি; সেন্ট গ্রেগরি, ভিকারুননিসা নূন, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, লিটল ফ্লাওয়ারসহ বহু প্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। অভিভাবকরা তীব্র সমস্যায় পড়েছেন।
কারণগুলো—অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল নিকাশী
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার মূল সমস্যাগুলো হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের ভরাট, পাকা কাভার বা কংক্রিটভিত্তিক বিস্তৃত নির্মাণ কাজের কারণে মাটিতে পানি শোষণের অযোগ্যতা এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না হওয়া। এছাড়া পলিথিন ও আবর্জনা নালায় জমে পানির স্রোত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকায় কাজ প্রায়ই অর্ধেক থেকে গিয়ে থেমে যায়।
নতুন সমাধান: সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান
ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন পৃথকভাবে নয়, যৌথভাবে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের দিকে এগোচ্ছে। ঢাকায় ‘সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা’ গঠনের পরিকল্পনায় মূলভাবে চারটি স্তম্ভ থাকছে—স্মার্ট ড্রেনেজ লাইন (ড্রেনের ঢাল বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ), খাল পুনরুজ্জীবন ও নাব্য বাড়ানো, আউটলেট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন (খাল থেকে বড় নদীতে পানি নিরবচ্ছিন্ন নির্গমনের পথ নিশ্চিতকরণ) এবং হাই-টেক পাম্পিং স্টেশন স্থাপন।
ডিএসসিসি-আইডব্লিউএম ও ডিএনসিসি-বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এ মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োগের জন্য ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (IWM)কে দায়িত্ব দিয়েছে; কাজের প্রথম ধাপে 10টি অঞ্চলে ব্লক ভাগ করে গভীরতর থ্রি-ডি ম্যাপিং করা হচ্ছে এবং পাঁচটি তীব্র জলোচ্ছ্বাস প্রবণ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান এই প্রয়াস নিয়ে আস্থা প্রকাশ করেছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উত্তর ঢাকার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে; প্রাথমিক সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়ন শিগগির মাঠ পর্যায়ে শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম: কোটি কোটি টাকার প্রকল্পেও ফল মেলেনি
চট্টগ্রাম শহর সামান্য বর্ষাতেই ডুবে যায়—পাহাড়ি ঢাল, জোয়ার-ভাটার মিশেলে পানি দ্রুত শহরে চলে আসে। গত কয়েক বছরে শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে কয়েকটি মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, তবু বর্ষায় পরিস্থিতি বদলাননি। চাক্তাই খাল থেকে শুরু করে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, চকবাজার, আগ্রাবাদ ও হালিশহরে বরাবরের মতো পানি জমছে।
চট্টগ্রামের সমস্যার মূলে—স্লুইস গেট পরিচালনা, পাহাড় কাটা ও সমন্বয়ের অভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খালের মুখে তৈরি রেগুলেটর বা স্লুইস গেটের সঠিক পরিচালনা অনেক ক্ষেত্রেই নেই; গেট বন্ধ রাখলে শহরের ভেতরের পানি বের হতে পারে না এবং কৃত্রিম বন্যা সৃষ্ট হয়। আরও রয়েছে পাহাড় কাটা ও বালু-মাটির ভরাট; পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু খাল ও ড্রেন ভরাট করে দেয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও সমস্যা জটিল করে তুলেছে। স্থানীয়রা বলছেন—ট্যাক্স দিয়েছেন, প্রকল্পের খবর শুনেছেন, কিন্তু বাস্তবে লাভের বদলে ঘরের ভিতরই নোংরা পানি ঢুকছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল: আর একটি মানবিক বিপর্যয়
ঢাকা-চট্টগ্রামের নগর বিপর্যয়ের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ি ঢল মারাত্মক মানবীয় ক্ষতি করেছে। গত 5 জুলাই’র পর মাত্র চার দিনে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় 1,000 মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে আবহাওয়াবিদরা বলছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে 39 হয়েছে—কক্সবাজারে 23 জন (এদের মধ্যে 13 জন রোহিঙ্গা), চট্টগ্রামে 8, বান্দরবানে 6 এবং রাঙ্গামাটিতে 2 জন। দুর্যোগে সাতটি জেলায় প্রায় 866,000-এর বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ভৌত অবকাঠামো ও জীবিকার ওপর আঘাত
বন্যার তোড়ে শত শত কিলোমিটার সড়ক ধসে গেছে, শতাধিক বিদ্যুতের খুঁটি লুটিয়ে গেছে, গ্রিড স্টেশন ডুবে গেছে—ফলেরত মোবাইল নেটওয়ার্কও ব্যাহত। লক্ষাধিক মানুষ এখন অন্ধকার, বিশুদ্ধ পানিহীন ও যোগাযোগবিহীন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
ত্রাণ-উদ্ধার ও আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট
জেলা জুড়ে 1,700টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা আছে; তবু সেখানে পানীয় জল, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও জরুরি ওষুধের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী স্পিডবোট ও হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ করছে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় সাহায্য অপর্যাপ্ত। পরিবেশ ও সড়ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা 16 জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করেছে।
আবহাওয়ার সতর্কতা ও সিদ্ধান্তের সময়
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কমপক্ষে দুই দিন ভারি থেকে অত্যাধিক ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে 3 নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি রয়েছে। তারা অনুমান করছে 14-15 জুলাই রাজধানীতে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমবে, কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টি বাড়ার সম্ভাবনা আছে।
উপসংহার
পুনরাবৃত্ত এই দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় থামবে না। নগরীনির্মাণের পরিকল্পনা, খাল-নালার ধরে রাখার কার্যকরি পদক্ষেপ, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন এখন আর বিকল্প নয়—সেগুলো বাস্তবায়ন ছাড়া শহরগুলো বারবার জলে ডুবতে থাকবে এবং মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।












