ঢাকা | মঙ্গলবার | ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ইইউ ২০২৬-এর প্রথম ছয় মাসে ইয়ামাল এলএনজি থেকে রেকর্ড গ্যাস আমদানি

ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেও রাশিয়ার ইয়ামাল এলএনজি থেকে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রেকর্ড পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করেছে। সাইবেরিয়ার এই বড় প্রকল্পের প্রায় পুরো উৎপাদন ওই সময়ছিলে ইউরোপীয় দেশগুলোতে পৌঁছায়—যা রাশিয়ার বিরুদ্ধে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কয়েক মাস আগে ঘটে।

বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে ইয়ামাল এলএনজি থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রায় ৯৮ লাখ ৯০ হাজার টন গ্যাস এসেছে; এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। অনলাইন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উরগেভাল্ডের হিসাব বলছে, এই আমদানির বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়াকে প্রায় ৬০০ কোটি ইউরো পরিশোধ করেছে।

দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট ভাবেই দেখা যায় ফ্রান্স সবচেয়ে বেশি—প্রথম ছয় মাসে তারা ৩৬ লাখ টন গ্যাস আমদানি করেছে। বেলজিয়াম ২৯ লাখ টন ও স্পেন ২৭ লাখ টন এনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে। উরগেভাল্ডের নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক প্রচারক সেবাস্টিয়ান রোটার্স এই প্রবণতিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, রাশিয়ার হামলার কারণে ইউক্রেনের অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থানের ওপর ক্ষতিসাধন বাড়লেও ইউরোপের এই আমদানি অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমান ইইউ নিয়ম অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে রাশিয়ার এলএনজি কেনা নিষিদ্ধ। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে ছাড় থাকায় ইয়ামাল থেকে আসা চালানগুলোর অধিকাংশকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে অনুসরণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি চালান কোথা থেকে আসছে তা প্রমাণ করতে হয়। তবুও ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাশিয়ার এলএনজি আমদানির ওপর ইউরোপে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা, যার ফলে রাশিয়াকে নতুন বাজার খুঁজতে হবে।

ইয়ামাল প্রকল্পের সফল রপ্তানিতে বিশেষ ‘আরক৭ আইস-ক্লাস’ ট্যাংকারগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। এসব বরফভেদী ট্যাংকার দ্রুত ইউরোপীয় বন্দরে পৌঁছাতে সক্ষম হওয়ায় রাশিয়ার রপ্তানি সহজ হয়েছে। ফলত এশিয়ার দিকে রপ্তানি চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে মাত্র ৫ লাখ ১০ হাজার টনে নেমে এসেছে। তাছাড়া এই আইস-ক্লাস জাহাজগুলোর মেরামতের জন্য এখনও বেশ কিছু ইউরোপীয় শিপইয়ার্ড—ফ্রান্স ও ডেনমার্কের মতো—এর ওপর নির্ভরতা আছে।

উরগেভাল্ডের সেবাস্টিয়ান রোটার্সের মতে, ‘ইয়ামাল এলএনজি একটি ছোট, বিশেষায়িত জাহাজ বহর নিয়ে কাজ করে; রপ্তানি চালাতে এতে ইউরোপীয় বন্দর, সেবা ও বাজারের ওপর ব্যাপক निर्भरতা রয়েছে।’ প্রকল্পটি ২০১৭ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতিতে শুরু হয় এবং বর্তমানে এটি রাশিয়ার প্রধান এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। নোভাটেক প্রধান দায়ীতে থাকা প্রকল্পটিতে অংশীদার হিসেবে রয়েছেন ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস ও চীনের সিএনপিসি।

টোটালএনার্জিসের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক পুয়ানে গত ফেব্রুয়ারিতে বলেছিলেন, ইইউর নিষেধাজ্ঞার বিধানগুলোর মধ্যে কিছু ‘অস্পষ্টতা’ থাকা করেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে অপশন আছে—প্রয়োজনে তারা শুধু ইউরোপে নয়, ইয়ামাল প্রকল্প থেকে গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করতেও বাধ্য হতে পারে। এই বিবৃতিটি প্রকল্পকে ঘিরে থাকা অর্থনৈতিক ও নীতিগত জটিলতারই ইঙ্গিত দেয়।

সংক্ষেপে, যুদ্ধের মধ্যেও ইউরোপের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবহার করে রাশিয়ার ইয়ামাল এলএনজি চলমান রয়েছে এবং ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সেটি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু সামনে আসন্ন নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ পরিস্থিতি দ্রুত বদলে দিতে পারে।