ঢাকা | মঙ্গলবার | ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

বন্যা-ভূমিধসে সাত জেলায় নিহত ৫১, পানিবন্দি ১০ লাখেরও বেশি

গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ফলে দেশের সাত জেলায় ব্যাপক বিধ্বংসী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দুর্যোগের তীব্রতায় এ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ এবং প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি পরিস্থিতিতে মানবেতর জীবন যাপন করছেন—এ তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

মন্তব্য্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মোট ৫৯টি উপজেলা বর্তমানে প্লাবিত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রাণহানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮ জন কক্সবাজারের বাসিন্দা। চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা—বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ এলাকায় যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন। বসতঘর ও গ্রামীণ সড়ক পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় নৌকা এখন একমাত্র চলাচলের মাধ্যম। বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শেলী আক্তার বলেন, “চোখে ঘুম নেই, পেটে ভাত নেই। পানি নামার নামমাত্র নেই, আর কোথায় ভরসা করবো বুঝি না। অন্য ঘর বানানোর মতো সামর্থ্যও নেই।” তাঁর মতো লাখো মানুষের ঘরে রান্নার চুলা জ্বালানো যাচ্ছে না এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ নলকূপ তলিয়ে যাওয়া বা কাজ বন্ধ থাকায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

সিলেট বিভাগেও পরিস্থিতি হু হু করে খারাপের দিকে যাচ্ছে—বিশেষ করে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে। হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় কষ্টভারত জীবনযাপন করছে; জেলার নিচু সর্বত্র এখনও প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট পানি জমে রয়েছে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বনগাঁও গ্রামের সিরাজ মিয়া বলেন, “ঘরে পানি, গরু-ছাগলগুলোকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখা হয়েছে। কৃষিজমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে পানি না নামলে ক্ষতি আরও বাড়বে।”

সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনাতেও নদ-নদীর পানি বাড়ছে; ফলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। কুড়িগ্রামে নদীর তীব্র ভাঙনে নদীপাড়ের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ৫ জুলাই থেকেই চট্টগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং আগামী কয়েকদিনও এর ধারাটা অব্যাহত থাকতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এক দিনের মধ্যে কিছুটা উন্নতি পেতে পারে; তবে সিলেট অঞ্চলের অভাবনীয় উন্নতি entirely নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ বৃষ্টিপাতের ওপর।

তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পানি নামতে শুরু করলেও সেখানে অবকাঠামো ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান। জুমের ক্ষেত এবং আমন-আউশের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় কৃষকেরা মারাত্মক সমস্যার মুখে। যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও অনেক সড়ক ও সেতু ধসে পড়ায় পুনরুদ্ধার কাজ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেবা, ওষুধ ও পরিচ্ছন্ন পানির ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠলে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হবে—এমন উদ্বেগ জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।