ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থা কমে আসায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলেই উপসাগরীয় দেশগুলোইরানের সঙ্গে ভিন্ন পথে সমঝোতা করতে চাইছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে তেহরানকে নিয়ে নিজস্ব চুক্তি করার পরিকল্পনা চাপাটাচ্ছে—এটি আমেরিকা ও ইরানের আলোচনার চলমান প্রক্রিয়ার পাশাপাশি, কিন্তু সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে এগোচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে আঞ্চলিক পর্যায়ে গোপন ও আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে। প্রথমবার কথা হয়েছে ইরান ও ওমানের মধ্যে, তারপর ওমান ও কাতারের, এরপর ইরান ও সৌদি আরবের—সবশেষে কাতার ও সৌদি আরবের। এসব বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য: সংঘাত থামার পর আঞ্চলিক সহাবস্থার রূপরেখা কী হবে, তা চূড়ান্ত করা।
কূটনীতি ও কৌশলের এই তৎপরতা নতুন নয়—বরং ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। বিশেষত হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ, নৌপথের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলের শর্তাদি নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। এক ধারণা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে ‘সার্ভিস ফি’—অর্থাৎ হরমুজ থেকে মাইন সরানো, পরিবেশগত ক্ষতি কমানো, বন্দর চার্জ বা বিমাসংক্রান্ত সেবা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হবে। তবে কে এই তহবিল পরিচালনা করবে, ফি সংগ্রহের ধরন কী হবে এবং অর্থ কার হাতে পৌঁছাবে—এসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এখনও অনসুলভ।
ইরান ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের নতুন গালফ স্ট্রেইট অথরিটি জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হরমুজ পাড়ি দেওয়া অনেক জাহাজে এখন থেকে ইরানি বিমা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। তেহরান ও ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি করার জন্য যে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করেছে—প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬০ দিন—সেই সময়ের পর থেকে এই নিয়ম কার্যকর করার কথা বলা হচ্ছে।
থিঙ্কট্যাঙ্ক ও বিশ্লেষকদের মতামতও মিশ্র। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গোনুল তোল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশেই কমে গেছে—এটা কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে ঘটছে। এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ভাবনা হচ্ছে, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদেরই নিজস্ব বোঝাপড়া দরকার; যদি তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে, সেটা অস্বাভাবিক হবে না।’
একই সময়ে কিছু প্রকাশ্য কূটনৈতিক বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সুরে মিল রাখছে। মার্কো রুবিওর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক আঞ্চলিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে ‘মুক্ত, নিঃশর্ত ও অবাধ নৌযান চলাচল’-এর ওপর জোর দেয়া হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে ‘কোনো ধরনের টোল, ফি বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার’ যে কোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। থিঙ্কট্যাঙ্ক চ্যাটাম হাউসের আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি এ ধরনের ফি-নিশ্চয়ের কথা ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছেন।
তবে কূটনীতিক ও বিষয়বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন—ইরান সহজে তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী হাতছাড়া করবে না। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোকে বাস্তববাদী হতে বাধ্য করা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃঢ় অবস্থান, ‘কোনো ধরনের চার্জ নেওয়া যাবে না’—এই বক্তব্য থাকায় ফি ধার্য করা আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত নজিরও তৈরি করতে পারে। তবে কিছু আন্তর্জাতিক সমুদ্র চুক্তিতে নির্দিষ্ট সেবা প্রদানের বিনিময়ে ফি ধার্য রাখার সুযোগ থাকা কথাও তুলে ধরা হয়।
মেরিটাইম সিকিউরিটি নিয়ে নিরাপত্তা ইস্যু ইতিমধ্যেই সংঘটিত ঘটনার মধ্য দিয়ে খারাপের দিকে বাড়ছে। জাতিসংঘ, ইরান ও ওমানের সমঝোতার পরও আইআরজিসি হরমুজে জাহাজগুলোর নির্দিষ্ট রুটে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দাবি করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এক ঘটনায় তাইওয়ানিজ একটি শিপিং অপারেটরের জাহাজে আঘাতের কথা বলা হয়; আমেরিকান কর্মকর্তারা জানান, ঘটনায় ইরানি ড্রোনের হামলার অভিযোগ উঠেছিল। এরপর তেহরান ও ওয়াশিংটন মাঝে মধ্যেই পাল্টা পাল্টি সামরিক তৎপরতা করে; হালনাগাদভাবে উভয়পক্ষ নতুন হামলা এড়াতে আপাতত সাইলোড করছে।
নিরাপত্তা-চাপের এই ছবি উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে একটি স্পষ্ট সতর্কবাণী। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সুফান সেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হুমকি-হামলা ‘বিশেষত ওমানের মতো দেশের জন্য ঘন ঘন অপরিহার্য সতর্কবাণী’—অর্থাৎ সহযোগিতা না করলেই আন্তর্জাতিক নৌপথ লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উপসাগরীয় দেশ নিয়ে গবেষণাধ্যায় নেতৃত্বে থাকা ইয়াসমিন ফারুক বলেন, অনেক দেশই এখন এমন এক নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে যেখানে আগের স্বাভাবিক অবস্থা আর ফিরে নাও আসতে পারে—তাই তারা এখন নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে নিতে চায়।
নজিরবিহীন সমুদ্রপথ ও ভঙ্গুর আঞ্চলিক রাজনীতির মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর পছন্দের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। নিরাপত্তা নিয়ে বড় আকারের আলোচনা যেখানে সৌদি আরব নেতৃত্বে এগোতে পারে, সেখানে হরমুজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও বাড়বে। পাশাপাশি ইরাকভিত্তিক কোনো জোটও গঠন হতে পারে—বিশেষত যাদের অর্থনীতি সরাসরি এই প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
সংক্ষেপে বলা যায়, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজস্ব কূটনৈতিক পথ খোঁজার চেষ্টা করছে—তারা চান হরমুজের নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে অংশ রাখতে, আর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে বাস্তবসম্মত, নিজেদের স্বার্থে উপযোগী সমঝোতা গড়ে তুলতে। কিন্তু কীভাবে তা কার্যকর হবে, তাতে ইরানের অবস্থান, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ত্রুটিহীনতার সম্ভাবনা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—এসব মিলিয়ে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে কঠোর কূটনৈতিক আঘাত-প্রতিঘাত চালিয়ে যেতে হবে।













