ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই। সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত জটিলতা, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন; প্রায় আট মাস হাসপাতালে চিকিৎসা চলে।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোরালিয়া গ্রামে রক্তমাখা রাজনৈতিক জীবনের এক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য ঘটে—জন্মভূমির মাটিতে বাবা-মা ও প্রয়াত স্ত্রীর কবরের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। দাফনের আগে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাজনৈতিক নেতারা, সরকারি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং হাজারেরও বেশি সাধারণ নাগরিক সমবেত হন। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান শেষে মরদেহ গ্রামের বাড়ি নেওয়া হয়। স্থানীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে আরেক দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে সম্মানজনকভাবে সমাহিত করা হয়।
গ্রামের প্রতিবেশী ও স্বজনরা বলছেন, তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দৈর্ঘ্যশীল অধ্যায় বন্ধ হয়ে গেল। ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমী বলেন, ‘‘ব্যক্তিগতভাবে আমি গভীরভাবে শোকাহত। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে তার সঙ্গী ছিলাম—ভোলাবাসী একজন অভিভাবক হারাল।’’
কবর খোঁড়ার কাজে দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময় অভিজ্ঞ গোরখোদক আবু তাহের জানান, তিনি নানা পরিবারের অসংখ্য কবর খুঁড়েছেন; আজ তোফায়েল আহমেদের কবর খুঁড়ে মন কেমন ব্যথিত হয়েছে। স্থানীয়রা স্মরণ করেন, যখনই তোফায়েল গ্রামের বাড়ি আসতেন, তিনি নিয়মিত বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতেন, কোরআন তেলাওয়াতে বসতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন। তার পরিবার ও স্বজনরা দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।
জীবনীসংক্ষিপ্ত: তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা জীবন শুরু হয় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে; পরে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক করেন এবং এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়; ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং ডাকসুর উপ-অধক্ষ হিসেবে থাকা সময়ে তিনি ছাত্রসমাজে জনপ্রিয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজনৈতিক বিরাট ভূমিকা: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দিয়ে তোফায়েল দেশের জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসেন। ওই আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ আসে—১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন। এই মঞ্চ ও অনুষ্ঠান স্বাধীনতা চলমান সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামের এক ল্যান্ডমার্ক হয়ে আছে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’ এর চার প্রধানের একজন হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন এবং স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে মুজিবনগর সরকারের কাজকর্ম, সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন-সহ নানা দায়িত্ব পালন করেন।
করণীয় ও সংগ্রাম: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরকার রাজনৈতিক অস্থিরতায় গ্রেপ্তার হন তিনি এবং প্রায় ৩৩ মাস কারাবন্দি থাকেন। কারাগার জীবনেও তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং মুক্তির পর দলকে পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম ও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি নিয়মিত সক্রিয় ছিলেন এবং প্রভাব রেখেছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মজীবন: তোফায়েল আহমেদ মোট ১২ বার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত রাজনৈতিক পথচলা তিনি অব্যাহত রেখেছেন। দলের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেছেন; দীর্ঘ সময় দায়িত্বশীল পদে থেকে দলীয় কৌশল ও নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৪-২০১৯ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।
জীবনের শেষদিকে রাজনৈতিক জীবনে কিছুটা নীরব ও আড়ালে চলে গেলেও দেশের বিষয়গুলোতে তার আগ্রহ ছিল অব্যাহত। সমসাময়িক নেতারা, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ও স্বজনরা মনে করেন—স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বর্তমান দিনের রাজনীতির নানা অধ্যায়ে তার অংশগ্রহণ ও অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় থাকবে। জন্মভূমি ভোলা থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে বিদায় জানানো হলো।













