ঢাকা | শুক্রবার | ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

প্রভিডেন্ট ফান্ডে শতকোটি টাকা বকেয়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যতে হাজারো চা-শ্রমিক

দেশের চা-শিল্পের অনেক শ্রমিকের অবসরকালীন ভরসা প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) এখন গভীর ঝুঁকির মুখে। ১৬৭টি চা-বাগানের মধ্যে ৫৮টিতে শ্রমিকদের জমাকৃত পিএফ টাকা বকেয়া পড়ে আছে — বকেয়ার মেয়াদ বাগানভেদে তিন মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক তাঁদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়কে নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে চা-শ্রমিকদের মূল বেতনের ৭.৫% কাজী কেটে নেওয়া হয় পিএফ-এ জমা করার জন্য এবং বাগান কর্তৃপক্ষ সমপরিমাণ অর্থ যোগ করে মোট ১৫% জমা দেয়। এছাড়া প্রশাসনিক ব্যয় বাবদ এই মোট তহবিলের ওপর অতিরিক্ত ১৫% অর্থ বাগান কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ হিসাবে জমা করতে হয়। শ্রমিকরা বলছেন, তাদের অংশের টাকা নিয়মিতভাবে কেটে নেওয়া হয়, কিন্তু মালিকপক্ষ সেই টাকা সময়মতো তহবিলে জমা না করায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি অভিযোগ করে বলেন, ‘শ্রমিকদের টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে, পরে বাগান কর্তৃপক্ষ সেই অর্থ দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। ফলে সময়মতো জমা না হওয়ায় শ্রমিকদের পাওনার ওপর সুদও কমে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।’

ভবিষ্যত তহবিল নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৮ ফেব্রুয়ারির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ৫৮টি বাগানে পিএফ বকেয়ার পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি ছাড়াতে পারে। সরকারি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক তৎপরতায় প্রায় ১০ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে।

আলীনগর চা-বাগানের কর্মী সত্য নারায়ণ এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, ‘নিয়ম আছে অবসরের তিন মাসের মধ্যে টাকা পাবেন, কিন্তু আমাকে এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ছোট আয়ের মানুষ হিসেবে ওই টাকা ছাড়া জীবন চালানো দায় হয়ে পড়ে।’ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ কুন্দ বলেন, ‘স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জন্য এই সঞ্চয়ই আর্থিক নিরাপত্তার মূল ভরসা। যদি এটি অনিশ্চিত হয়, তাহলে অনেকের জীবনই বিপন্ন হবে।’

বাগান মালিকপক্ষ বলতে জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি লোকসান এবং তুলনামূলকভাবে কম চা মূল্য পরিস্থিতি জটিল করেছে। সাতগাঁও চা-বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান দাবি করেন যে, সমস্যা আছে কিন্তু দ্রুত বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অফিসিয়াল নজরদারিও তীব্র। বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক (নিয়ন্ত্রক প্রভিডেন্ট) মহব্বত হোসাইন বলেন, ‘বকেয়া আদায়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে। আমরা ছয়টি বাগানের বিরুদ্ধে শ্রম আইনে মামলা করেছি এবং ৫৮টি বাগানকে নোটিশ/চিঠি দেওয়া হয়েছে। ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি চলবে।’

বর্তমানে একটি ট্রাস্টি বোর্ড শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে এই তহবিল পরিচালনা করছে। শ্রমিক নেতারা দাবি করেন, তদারকি আরও জোরদার করা হোক এবং প্রতিমাসে কাটা টাকা সত্যিই প্রতিমাসেই তহবিলে পৌঁছে যাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে তৎপরতা বাড়াতে হবে, যাতে তাদের অবসরের নিরাপত্তা রক্ষিত থাকে।