রাতে আঁধারের আড়ালে রূপগঞ্জের কৃষিজমি, আবাসন প্রকল্প ও সড়ক-বলয় সবটাই লক্ষ্য করে চলছে বেপরোয়া মাটি ও বালু কাপন। একদল মাটিখেকো চক্র দেড় বছর ধরে করটিয়া, আঙ্গারজোড়া, ইসলামপুর, রানীপুরা, বিরাব ও আতলাপুরসহ আশপাশের এলাকায় তৎপরতা চালিয়ে কৃষক ও স্থানীয়দের জীবিকা জিম্মি করে রেখেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, রঙিন লাইট-ধোঁয়াশা নয়—রূপগঞ্জের রাত এখন ভেকুর কর্কশ শব্দ আর অপ্রশাসিত ড্রাম ট্রাকের ধুলোয় ভরে যায়। তিলতিল করে জমে থাকা কৃষির স্বপ্ন, কোটি কোটি টাকার ভরাট বালি—সবই মুলোসাতে কাটা হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে কয়েকটি আবাসন প্রকল্পের জন্য ভরাট করা কোটি কোটি টাকার বালু রাতারাতি ড্রাম ট্রাকের সাহায্যে উধাও হয়ে গেছে, একই সঙ্গে কৃষকের জমির মাটিও লুটে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০টি ভেকু (খননস্থল) থেকে মোট প্রায় ৬০০টি ড্রাম ট্রাক মাটি-বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। লুট করা এসব মাটির মূল্য একাধিক কোটির ওপরে। অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, রাতে প্রতি সন্ধ্যা প্রায় ৪৫০ থেকে ৬০০টি ড্রাম ট্রাক বালি পাচার করা হচ্ছে؛ প্রতিটি ট্রাকে বালুর মূল্য ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা হওয়ায় মাসে পাচার হওয়া বালুর পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাছাকাছি।
এই বালু ও মাটি ভেকু দিয়ে তুলে বিক্রি করা হচ্ছে বাইরে থাকা ইটভাটায় ও স্থানীয় বালুর গদিতে। করটিয়ার চা বিক্রেতা আলী হোসেন বলেছেন, “সন্ধ্যার পরে টেরাক—টেরাক করে ট্রাক আসে, দিন কম, রাত বেশি।” স্থানীয়রা বলছেন কৃষিজমিও লুটের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
এক ভেকু চালক একথা মেনে নিয়ে বলেন, “আমরা নির্দেশ মেনেই চলি।” রিকশাচালক আতাউর অভিযোগ করেছেন, “আমরা গরিব মানুষ; ধুলা-দূষণের কারণে গাড়ি চালানো যায় না, তবু সন্ধ্যায়ই বালু চোরের গাড়ির সারি বসে।” তীব্র পিচঢালা ধুলো ও চলাচলের ফলেই রাস্তাঘাটেরও চরম ক্ষতি হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক জমির হোসেন বলেন, “আমাদের জমি থেকে মাটি কেটে দিয়ে জমিই শেষ করে দিয়েছে তারা। এখন আমরা কোথায় যাব?” তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহয়তা পেলেও প্রতিকার পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন।
স্থানীয়রা জানায়, পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তিনজন প্রভাবশালী “মাটিখেকো”, যাদের অধীনে শক্তিশালী ক্যাডার ও দোসর-দল আছে। তারা রাতের পাহারা দেয় এবং কটিয়াদি এলাকা থেকে পুরো অপারেশনের সমন্বয় চালানো হয়। যদিও প্রশাসন মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালায়, কিন্তু বাৎৎমনদের মূল হোতারা ধরাছেঁড়া থেকে বাইরে থাকেন।
গত বছরের ২২ মে ভুক্তভোগী মোজাফফর হোসেন ভূইয়া রূপগঞ্জ থানায় মাটি চুরির অভিযোগ এনে মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে করটিয়ার বাসিন্দা কবির মিয়া (৫৫), তারেক (২২), শামীম (৩৫) ও আরিফ (২৬); রানীপুরার বাচ্চু ওরফে চাল বাচ্চু (৫২), ইমন (২৮); কুরাইল আতলাপুরের সুমন (৩২), গুতুলিয়ার হুমায়ূন কবীর জুয়েল (৪৪), পূর্বের গাঁওয়ের মুহিত মোয়া (৪২), সেলিম মোল্লা (৫২), কেরাব চৌধুরীপাড়ার আশ্রাফুল ও ইসমাইল (৪০)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে ও ব্যাপক মাটি-উৎপাটন চললে রূপগঞ্জের ভৌগোলিক গঠন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে ভূমিধস, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিপর্যয় ভয়াবহ আকার নিতে পারে। স্থানীয়দের ও পরিবেশবিদদের মতে, ‘উন্নয়ন’ ভেবে চলা এই বুনন রূপগঞ্জকে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
রূপগঞ্জ থানার ওসি এ এইচ এম সালাউদ্দিন বলেন, “আমি নতুন এলাম। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” স্থানীয়রা এখন দ্রুত, সমন্বিত ও শক্ত অবস্থান প্রত্যাশা করছেন যেন কৃষি জমি, মানুষ ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।














