মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে জানা গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলায় সহায়তা করবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই সূত্র দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন একটি ঐতিহাসিক চুক্তি ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সূত্রগুলো বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের মূল অংশ হবে সৌদি আরবে পরমাণু আওয়েজ, উৎপাদন ও প্রাসঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ দিতে সহায়তা করা। উত্তরাধিকারে নয়—আভাসিত চুক্তিতে এমন ধারা আছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, যা অনুযায়ী প্রাইভেট মার্কিন প্রতিষ্ঠানরা ৩০ বছর মেয়াদি সময়সীমায় সৌদিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারবে।
এই খবর এসেছে এমন এক সময় যখন তেহরানের পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ইরানের পরমাণু পরিকল্পনা নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে—এই কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রসঙ্গই সৌদিতে পরমাণু সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাকে ত্বরান্বিত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি আনুষ্ঠানিক করতে বুধবার সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষর বা ঘোষণার ভাবছে। প্রশাসন জানিয়েছে, এই চুক্তি মার্কিন পারমাণবিক শিল্পে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সৃষ্টি করবে।
তা সত্ত্বেও এই প্রকল্পকে কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য এবং ইসরায়েলি নেতারা তীক্ষ্ণভাবে সমালোচনা করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বেসামরিক নামে যেসব প্রযুক্তি সরবরাহ করা হচ্ছে সে সব ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার হওয়া থেকে বিরত রাখা কঠিন হতে পারে। এ কারণেই কংগ্রেসে চুক্তি উপস্থাপিত হলে তাতে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক উঠতে পারে—যদিও সূত্র বলছে, কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ অনুমোদন ছাড়া চুক্তিটি কার্যকর করা যেতে পারে।
সৌদি আরব বহু বছর ধরেই নিজ দেশের শক্তি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বকীয়তার দাবি তুলে এসেছে; বেসামরিক পারমাণবিক পরিচালনার অধিকারও সে দাবির অংশ। যুক্তরাষ্ট্র এমন পারমাণবিক চুক্তিকে তাদের বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসাবে বিবেচনা করছে—এর মধ্যে সৌদি ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাবনা এবং দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তিও আছে বলে জানা যায়।
ইতিহাসসূত্রে বলা যায়, ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার চুক্তি করেছিল—তবে আমিরাতের নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরণের পরমাণু কেন্দ্রে লক্ষ্য করে হামলারও ঘটনা ঘটেছে; গত মে মাসে আরব আমিরাতের পারমাণবিক স্থাপনা সংলগ্ন একটি জেনারেটরে ড্রোন হামলা হয়, যা নিরাপত্তা সংশয় বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যদি বাস্তবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিযোগিতার সূত্র ধরে আরও দেশই একই পথে যেতে পারে—এটাই মূল নিরাপত্তা উদ্বেগ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এলাকাজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর আশংকা তৈরি করেছে। এর প্রভাব পরিমাপ করতে গেলে সামুদ্রিক সরবরাহ-রুটে হুমকিও আছে—ইরানের মিত্র হুতি বিদ্রোহীরা এই যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার হুমকি দিয়ে সৌদি বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কাঁচামাল তেলের সরবরাহে বিপুল প্রভাব ফেলতে পারে।
উপসংহারে বলা যায়, সৌদিতে বেসামরিক পারমাণবিক সক্ষমতা স্থাপনের উদ্যোগ কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত এক জটিল পদক্ষেপ। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের ঘোষণার পর সেটির বিশদ শর্ত, কন্ট্রোল এবং অঞ্চলীয় প্রভাব নিয়েই সামনে আরও তীব্র রাজনীতি ও কূটনৈতিক আলোচনা বেড়াবে।













