দুই বছর আগে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবার বিশ্বকাপও জিতল স্পেন। সোমবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তা কোচিংয়ে তরুণ লা রোজা ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বখেতাব জিতেছে।
গত কয়েক বছরের আকাশছোঁয়া সাফল্য পুনরাবৃত্তিই যেন এই জয়ের মর্মকথা। ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত স্পেন মোট ১৬টি শিরোপা জিতেছে—এর মধ্যে নারী দলটি ১১টি এবং পুরুষ দলটি ৫টি ট্রফিই জোগাড় করেছে।
বিশ্বকাপ শুরুটা যদিও হতাশাজনক ছিল—কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দেখে কিছুমাত্রা সন্দেহও জেগেছিল। কিন্তু পরে দলটা বদলে গেল; ধারাবাহিক সাফল্য, আক্রমণে চাপ আর প্রতিপক্ষকে গোল করতে না দেওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় ফাইনালে উঠে এলো লা রোজা।
ম্যাচ জুড়ে স্পেনই আক্রমণে এগিয়েছিল। বল দখলে রাখতেও তারা আধিপত্য দেখিয়েছে—৬৫ শতাংশ পজেশন ছিল তাদের। পাসিং-স্ট্যাটিস্টিক্সেও স্পেন অনেক এগিয়ে ছিল: মোট পাস ছিল ৮৫২টি, আর সফল পাসের সংখ্যা ছিল ৭৬২টিতে পৌঁছে—আর্জেন্টিনার ৪৬৪ পাসের বিপরীতে স্প্যানিশদের সংখ্যা ছিল দ্বিগুণের কাছাকাছি।
খেলায় স্পেনের লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ ছিল বেশি; পুরো ম্যাচে তাদের শট ছিল প্রায় ২০টি। আর্জেন্টিনার তরফ থেকে লক্ষ্যে মাত্র দুইটি শট দেখতে মিলল—আর এসবই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টাইন গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অসাধারণ সেভে রুদ্ধ হয়ে যায়। মার্টিনেজ ম্যাচে ১১টি সেভ করেন, যা কোনো বিশ্বকাপ ফাইনালের গোলকিপারের জন্য নজিরবিহীন পারফরম্যান্স ছিল।
ফুটবলয়াত্রার শুরু থেকেই ম্যাচে উত্তেজনা ছিল। স্পেনের বাম প্রান্ত থেকে এগিয়ে এসে ওয়ারজাবালের ক্রসে আলোচনায় থাকা মুহূর্তগুলো আসে; ইয়ামাল ও ওলমোর তৈরি করা প্রথম সুযোগগুলো মার্টিনেজ রুখে দেন। ম্যাচ জুড়ে ল্যাপোর্টে, রদ্রি ও বায়েনা মাঝমাঠ ও আক্রমণে একে–অপরের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে বল ঘোরায়—ফাবিয়ানের টাচ ও ওয়ারজাবালের শট বারবার আর্জেন্টাইন রক্ষণকে পরীক্ষায় ঠেলে দেয়।
আর্জেন্টিনা খেলায় জ্বালানি ছিঁড়ে দিতে পারছিল না। যদিও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ একজন খেলোয়াড় হিসেবে বলভাগে লড়াই করেছেন, ৪১ মিনিটে তাকে হলুদ কার্ডও দেখানো হয় এবং ইনজুরি সৃষ্টি হওয়ায় নিকোলাস ওতামেন্দিকে মাঠে নামাতে হয়। ম্যাচের পজেশন ও পাসিং কৌশলে স্প্যানিশরা চালকদল হিসেবে পুরো সময় সুবিধা নিয়েছিল।
দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণ বাড়িয়ে স্পেন দাপট বজায় রাখে। উভয় দল নানা পরিবর্তন আনে—স্কালোনি তার আক্রমণে পরিবর্তন আনলেও আর্জেন্টিনা কোনো বড় সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। পারেদেসের অনাগ্রহী ফাউল ও পরে এনজো ফার্নান্ডেজের দ্বিতীয় হলুদ কার্ড—এসব ঘটনার মধ্যে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত খেলায় চাপ রাখতে পারেনি।
ম্যাচে উত্তেজনার সবচেয়ে বড় মোড় আসে অতিরিক্ত সময়ে। প্রথমে ৯৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের গোল বাতিল করা হয়—ভিএআর সিদ্ধান্তে মেরিনোর ওতামেন্ডির ওপর করা ফাউল দেখা যায় এবং গোল বাতিল রইল। এরপর অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আরও একটি গোলটি গণ্য করা হয়নি কারণ ১১৩ মিনিটে তোরেস অফসাইড অবস্থায় ছিলেন।
অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের শেষ অংশে—দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর—পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে উইলিয়ামসের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে, এবং বদলি খেলোয়াড় তোরেস তা জোরালোভাবে জালে ঠুকে দেন। এই গোলে স্পেন ১-০ করে এগিয়ে যায় এবং সেটাই চূড়ান্ত জয় নিশ্চিত করে। তোরেস ফাইনালের পঞ্চম বদলি হিসেবে মাঠে এসে গোল করে দলকে ট্রফির স্বাদ এনে দিলেন।
শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা কিছু কৌশলগত আক্রমণ আর মেসির শট চেষ্টা করলেও সেটাও স্পেনের রক্ষণভাগ ও সেভকারী উনাই সিমন আটকাতে সক্ষম হন। ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যান স্প্যানিশ দলের আধিপত্যই দেখিয়েছে: বল দখলে, পাসিং ও শট নির্মাণ—সব দিকেই তারা এগিয়ে ছিল।
এই জয় স্পেন ফুটবলের নতুন প্রজন্মের দৃঢ়তা, পরিকল্পনা ও ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। লুইস দে লা ফুয়েন্তার নেতৃত্বে তরুণি শক্তিই এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট তুলে দিল—২০১০ সালের স্মৃতি এখন পুনরাবৃত্ত হওয়া ইতিহাসে বদলে গেল।














