রেকর্ড ভাঙা তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় ফ্রান্স এখন গভীর মানবিক ও পরিবেশগত সংকটে পড়ে আছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বিধ্বংসী দাবানল তীব্র বাতাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে বসেছে।
দীর্ঘ দিন ধরেই চলা খরা, অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ তাপমাত্রা এবং ঘণ্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া ঝড়ো বাতাস আগুন নেভানোকে কঠিন করে তুলেছে। আউদ, পিরেনে-ওরিয়ঁতাল এবং বুশ-দ্যু-রোনের মতো এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড এখনও সক্রিয় রয়েছে। কেবল আউদেই প্রায় ৯০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি ইতিমধ্যেই ভস্মীভূত হয়েছে।
চলতি গ্রীষ্মে ফ্রান্সে এখন পর্যন্ত সাত হাজারেরও বেশি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে এবং মোটে প্রায় ৮৭০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণত জুলাইয়ের শেষের দিকে দাবানল শুরু হলেও এবার জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে আগেই তীব্রতা দেখা দিয়েছে।
প্রতিক্রিয়ায় প্রায় দুই হাজার দমকলকর্মী নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে সমন্বয়ে মোতায়েন করা হয়েছে অগ্নিনির্বাপক বিমান, ক্যানাডিয়ার টাইপ ভেসেল (ক্যানাডিয়ার) এবং হেলিকপ্টার। হাজার হাজার বাসিন্দাকে আগুনের কাছাকাছি থাকা এলাকায় থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে; তবে কঠোর আবহাওয়ার কারণে অনেক জায়গায় সড়ক ও বিমান চলাচল সাময়িকভাবে সীমিত করতে হয়েছে।
অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। হাসপাতালে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, ৪৫ বছরের বেশি বয়স্কদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে গেছে এবং ৮৫ বছরের ঊর্ধ্ব প্রবীণরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত সপ্তাহের তুলনায় বাড়িতে মৃত্যুর হার প্রায় ৯১ শতাংশ বেড়েছে বলে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। দিনের তাপমাত্রা ৪০°C ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং রাতেও ২০°C-এর নিচে নামছে না—এই অনবরত তাপ মানুষের শরীরের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টি করছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে তাপপ্রবাহ এখন পুরনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ঘনঘন ও তীব্র হচ্ছে, যা কৃষি, বায়ুমণ্ডল ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এনে দিচ্ছে। ফরাসি সরকার জরুরি বৈঠকের পরে বনাঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে এবং নাগরিকদের অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা কম, ফলে দাবানলের ঝুঁকি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো দুর্যোগ মোকাবিলায় সকল সম্ভাব্য সম্পদ ও কর্মীদের মোতায়েন করেছে, তবে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সময় ও সহমর্মিতা—দুইয়েরই প্রয়োজন।













