শিশু জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই তার নামে একটি ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডি’ নম্বর তৈরির প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এক আইডির আওতায় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন নাগরিকের সব সরকারি তথ্য ও সেবা একস্থলে রাখা হবে, ফলে আলাদা আলাদা আইডি বা বিভিন্ন দফতরে বারবার তথ্য দেওয়ার ঝামেলা দূর হবে।
প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের প্রস্তাবিত ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগের আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে, জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা।
আইসিটি বিভাগের যুগ্মসচিব মুজিবুর রহমান বলেন, এটি এখন কনসেপ্ট পেপার বা ধারণাপত্র পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রাথমিক আলোচনার পর পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা চলছে। পরিকল্পনা অনুসারে জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা তথ্যসহ নানা ধরনের সরকারি ডাটাবেসকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনা হবে, যাতে নাগরিক একটিমাত্র আইডি দিয়ে সব সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
প্রকল্পের কর্মসূচি, অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, কনসেপ্ট পেপার অনুমোদন পেলে বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে এবং ধারণাপত্রে আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে রোলআউট শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে; তবে দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। জুলাই থেকে প্রশাসনিক কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল আইডি তৈরির প্রক্রিয়া এমনভাবে করা হবে যে হাসপাতালে জন্মলগ্ন হলেই শিশুর তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থায় সংযুক্ত হবে। বাবা-মায়ের এনআইডির সঙ্গে মিলিয়ে নবজাতকের জন্য স্থায়ী ডিজিটাল আইডি তৈরি হবে। বাসায় জন্ম নিলে সে ক্ষেত্রে আলাদা প্রক্রিয়া থাকবে। পরে ওই একমাত্র আইডিই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্টসহ সব সরকারি সেবায় ব্যবহৃত হবে।
প্রকল্পে জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি সেবা, বিআরটিএসহ বিভিন্ন সরকারি ডাটাবেসকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন, বিটিআরসি ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
তথ্য শেয়ারিংয়ে নাগরিকের সম্মতির কথা রাখা হবে। কর্মসূচিতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (পার্সোনাল ডেটা প্রটেকশন) ও জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স নীতিমালা মেনে কনসেন্টবিহীন তথ্য শেয়ার করা হবে না। উদাহরণস্বরূপ, কোথাও শুধুমাত্র বয়স যাচাই প্রয়োজন হলে পূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য না দিয়ে কেবল বয়স সম্পর্কিত তথ্যই নাগরিকের সম্মতিতে শেয়ার করা হবে।
প্রকল্পের সঙ্গে একটি স্মার্টফোনভিত্তিক ডিজিটাল ওয়ালেট ও থাকবে। এই ওয়ালেটে নাগরিকের পরিচয়পত্র, ডিজিটাল ক্রেডেনশিয়াল ও সরকারি ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করা যাবে; সরকারি ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনগুলোতে লগইন বা পরিচয় যাচাইয়ের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা যাবে। তবে officials জানিয়েছেন, আপাতত এটি পেমেন্ট ওয়ালেট হিসেবে নয়, বরং আইডি ও ডকুমেন্ট ভল্ট হিসেবে পরিকল্পিত। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা আর্থিক লেনদেন সংযোজন নিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হবে।
নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতেও কাজ চলছে। এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরের ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি মডেল পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গঠনের চেষ্টা চলছে।
উদ্যোগটি আপাতত বিশ্বব্যাংক সমর্থিত ‘ডি-স্টার’ (ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাক্সেস অ্যান্ড রিজিলিয়ান্স) প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করে এগোবেই বলা হচ্ছে। ডি-স্টারএর আওতায় সরকারি ডিজিটাল সেবাগুলোর আধুনিকায়ন কাজ চলেছে, এবং এই প্ল্যাটফর্মের মধ্য দিয়েই একক ডিজিটাল আইডি বাস্তবায়নের কর্মসূচি চালানো হবে।
রেহান আসিফ আসাদ আরও জানিয়েছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই), ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদন শিল্প—এই চারটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগামী মাস থেকেই দেশের প্রথম ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল আইডি, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’ কাঠামো তৈরি করা যায়।
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নাগরিকরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাদের সব সরকারি পরিচয়, সনদ ও ডিজিটাল সেবাসমূহ একটি একক ডিজিটাল পরিচয়ের অধীনে পাবে, যাহা সময় সাশ্রয় করবে, প্রক্রিয়া সহজ করবে ও সেবা গ্রহণে হয়রানি কমাবে।













