বাংলাদেশের চিত্রকলা, টেলিভিশন ও পুতুলনাট্যের সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিভা, বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন ২০২৬) সকালে ফুসফুসে ব্যাপক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতার কারণে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) থেকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে মরহুমের বয়স ছিল ৯০ বছর। তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মুস্তাফা মনোয়ারকে গত ১৪ জুন ফুসফুসে তীব্র ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। রক্তচাপ কমে যাওয়া ও অক্সিজেনের মাত্রা ঝুঁকিপূর্ণভাবে নেমে এলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ দুই সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে আজ সকালে তিনি মারা যান।
মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলায় নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন; পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর। তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি গোলাম মোস্তফা ও জমিলা খাতুনের সন্তানে জন্মেছেন। শৈশবে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। পরে শিল্পকলার প্রতি প্রবল আকর্ষণে তিনি কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হন এবং ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে স্বর্ণপদকসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
কলকাতা থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফেরার পর তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরামর্শে চারুকলা ইনস্টিটিউটে (তৎকালীন আর্ট কলেজ) শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট (এনআইএমসি) এর মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোতে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুস্তাফা মনোয়ার ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না—বাংলাদেশে আধুনিক পুতুলনাট্য (পাপেট্রি) বিকাশ ও প্রসারে তিনি এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছিলেন। চিত্রকলা, টেলিভিশন প্রযোজনা, শিশু-বিনোদন এবং পাপেট থিয়েটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও বহুমাত্রিক বিকাশে তার অবদান যুগান্তকারী। তাঁর এই অনন্য সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মান অর্জন করেছেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ দেশের সাংস্কৃতিক জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। শিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে তাঁর ঢালা জীবনকাহিনি ও উপহারকৃত সঞ্চয় kommende প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে। শোক সন্তপ্ত পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে।












