ঢাকা | সোমবার | ২৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ইউরোপে তীব্র দাবদাহ: মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, এল নিনোয়ের আশঙ্কা তীব্র

ইউরোপ জুড়ে পূর্বেকার তুলনায় অস্বাভাবিক এবং তীব্র তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়েছে; প্রাণঘাতী দাবদাহে মৃত্যু ও অসুস্থতার সংখ্যা বাড়ছে এবং আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, এর সঙ্গে মিলিত হচ্ছে সম্ভাব্য ‘এল নিনো’—যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে দিতে পারে।

বিশ্বজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যেই আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ঘিরে তৈরি উত্তেজিত পরিস্থিতিতে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বন্যা, খরা ও আরও রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা ডেকে আনবে। ইতিমধ্যে এশিয়া থেকে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অংশ এই চরম আবহাওয়ার প্রভাব অনুভব করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের ৮৫০টি বড় শহরের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রেস’-এর মধ্যে রয়েছে। অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতার কারণে মানুষের ঘাম দ্রুত শুকায় না, ফলে শরীরের স্বাভাবিক কুলিং প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তাপজনিত দুর্বলতা ও মৃত্যু বাড়ছে।

দেশভিত্তিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: স্পেনে মোমো মনিটরিং সিস্টেমের হিসাব অনুযায়ী দাবদাহে অন্তত ৩২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বার্সেলোনার কাছাকাছি এক জঙ্গে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১৬ হাজার মানুষকে তাদের বাড়িতে অবস্থান করতে বলা হয়েছিল। ফ্রান্সে শীতলায়ন ব্যবস্থা ব্যর্থতার আশঙ্কায় রাজধানীসহ নানারকম জরুরি পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে; দাবদাহ শুরু হওয়ার পর অনেক অনিরাপদ ঠাঁইতে সাঁতার কাটা কিংবা গরম গাড়ির ভিতরে আটকে থাকাতে করে প্রাণহানি ও ডুবির মতো দুর্ঘটনায় দেশটিতে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে গেল শুক্রবার (২৬ জুন) জুন মাসের পূর্বের রেকর্ড ভেঙে গেছে। জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সারব্রুকেনে ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের লিমবার্গে ৩৯.৪ ডিগ্রি এবং যুক্তরাজ্যের সাফোকের ক্যাভেন্ডিশে ৩৭.১ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। ওইদিন ইউরোপে অন্তত ১৫ কোটি লোক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপকে মোকাবিলা করেছে।

স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ায় কর্তৃপক্ষ বহু কনসার্ট, ম্যারাথন ও বড় গণজমায়েত স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে—বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই বিষয়টি তুলে ধরেছে। অভিযোজিত পরিবহনেও প্রভাব পড়ে; কোলন থেকে প্যারিসগামী একটি ইউরোস্টার ট্রেন ব্রাসেলসের কাছাকাছি প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে বিকল হয়ে পড়ে এবং তীব্র তাপের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া কয়েকজনকে হাসপাতালে নিতে হয়।

গরমের দিক থেকে বিদ্যুৎ ও পরমাণু অবকাঠামোরও ওপর চাপ পড়েছে। সুইজারল্যান্ডের বেজনউ পারমাণবিক কেন্দ্রের দুটি রিয়্যাক্টর সাময়িক বন্ধ করা হয়েছে কারণ নদীর পানি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পৌঁছায়— যা রিয়্যাক্টর ঠাণ্ডা করতে পর্যাপ্ত নয়।

আবহাওয়া সংস্থা ও জলবায়ু গবেষকরা বলছেন, ইউরোপে উচ্চচাপের অবস্থার কারণে কয়েকটি দেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মৌসুমি গড়ের চেয়ে ৫–১২ ডিগ্রি বেশি। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানাচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং ইউরোপে উত্তাপ গ্লোবাল গড়ের তুলনায় দ্রুততর।

হিমবাহও প্রভাবিত হচ্ছে: সুইজারল্যান্ডের গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে এই গরমে হিমবাহগুলি অস্বাভাবিক দ্রুত গলছে—এমনকি সাধারণত আগস্টে হওয়া গলন-প্রক্রিয়া আগেভাগেই শুরু হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে চরম বন্যা ঝুঁকি এবং জল সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।

একদিকে ইউরোপে তাপপ্রবাহ বাড়ছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে একেবারেই উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে—জাপানে অতি প্রবল ঝড় ও ভারী বর্ষণ, ব্রাজিলে প্রবল বন্যা-জলোচ্ছ্বাসের সতর্কতা; এসবই এল নিনো বা জলবায়ু বিচ্ছিন্নতার সম্ভাব্য প্রভাবকে নির্দেশ করে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এল নিনো নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করে জানিয়েছে: আগামী আগস্টের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং নভেম্বরের মধ্যে এটি পূর্ণ শক্তি সঞ্চয় করার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। ডব্লিউএমওর মুখপাত্র ক্লেয়ার নুলিস সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও এল নিনোর সমন্বয়ে আমাদেরকে অনুকূলভাবে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প কমেই থাকে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ সংকটকে ভয়াবহ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, এল নিনো উষ্ণায়নশীল বিশ্বের পরিস্থিতি আরও তীব্র করবে এবং এর মোকাবিলায় দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রমশ কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিতে জোর দিতে হবে। জাতিসংঘও প্রস্তুতি নেয়া ও ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের পদক্ষেপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্ববাসী ও স্থানীয় প্রশাসনকে এখনই জরুরি প্রস্তুতি নিতে হবে—হিট রিলিফ সেন্টার বাড়ানো, পানীয় জল ও শীতলকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা, দুর্বল জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সক্রিয় কর্মসূচি চালু করা এবং বিদ্যুৎ ও জলবাহী অবকাঠামো রোধী করে তোলা আবশ্যক। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে কমে নবায়নযোগ্য শক্তি গ্রহণ ত্বরান্বিত করাই একমাত্র টেকসই প্রতিকার বলে বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন।

এই দাবদাহ ও এল নিনোর সম্ভাব্য মিলনের ফলে সামনের মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ধারা কেমন রূপ নেবে—তাই নজরদারি ও প্রস্তুতি না বাড়ালে মানবজীবন, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশে মারাত্মক ক্ষতি আঘাত হানতে পারে।