ভেনেজুয়েলায় গত বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ হয়েছে এবং জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এখনও ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ। দেশটির উপকূলীয় শহর লা গুইরা ও আশেপাশের অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে বহুজাতিক উদ্ধারদল এসে কাজ করলেও কাজটি ধীরগতিতে চলছে। লক্ষাধিক বাড়ি, বহুতল ভবন ও অবকাঠামো বিধ্বস্ত হওয়া ও রাস্তা-সেতু ভেঙে পড়ায় একাধিক স্থানে উদ্ধারকাজ কঠিন হচ্ছে।
ভূমিকম্প দুটি গত ২৪ জুন বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ঘটে; প্রথমটির মাত্রা ছিল ৭.২ ও পরে ৭.৫। রিখটার স্কেলে এ তীব্রতা দেশটির উত্তর উপকূল এলাকার বহু ভবন ধসে পড়ার কারণ হয়েছে। রাজধানী ক্যারাকাসের নিকটবর্তী লা গুইরাতে একের পর এক বহু ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার এ প্রার্থিত পরিস্থিতিকে ‘চলমান জটিল জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, লা গুইরারার একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে চিলির অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পৌঁছেছে। চারটি বহুতল ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ায় সেখানে শত শত পরিবার জীবিত বা মৃত—কেন তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারদলের প্রধান নাদিওমার পোলাঙ্কো বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভবনগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধসে যাওয়ায় জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা কম; বর্তমানে তাদের প্রধান কাজ মরদেহ খুঁজে বের করা এবং মৃতদের শনাক্ত করা।
অন্যদিকে বহু এলাকায় স্বজন, প্রতিবেশী ও স্বেচ্ছাসেবীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সম্ভাব্য জীবিতদের খুঁজছেন। স্থানীয়রা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ভারী যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার অভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ; বহু মানুষ বলেছেন তারা এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে দেখতে পাননি। ৪০ বছর বয়সী মারহোসলি সালাজার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তিনি তাঁর পাঁচ মাস বয়সী সন্তান গায়েলকে খুঁজছেন, একই সঙ্গে তাঁর ১৬ বছর বয়সী কন্যা ভূমিকম্পে নিহত হয়েছেন এবং আরেক আত্মীয় এখনও নিখোঁজ।
সরকারি ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো জানিয়েছেন, শনিবার (২৬ জুন) রাত ৮টা থেকে দুর্গত এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। একই সময়ে রাজধানীর কিছু অভিজাত এলাকায় অন্তর্বর্তী নেতা দেলসি রদ্রিগেজ পরিদর্শনে গেলে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা সরকারের উপর দায়প্রয়োগ করে স্লোগান দেন এবং উদ্ধারকাজে সরকারের অপ্রতুলতার অভিযোগ তোলেন।
হটলাইন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা: জাতিসংঘের মানবতাবিষয়ক সংস্থা ওসিএইচএ জানিয়েছে, অন্তত ১৭টি দেশের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে। স্পেন, এল সালভাদর, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের দলরা কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ২৫০-এর বেশি সদস্যবিশিষ্ট একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠানো হচ্ছে; এর মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ শনাক্ত করতে প্রশিক্ষিত কুকুরসহ তিনটি বিশেষ অনুসন্ধান-উদ্ধার ইউনিট রয়েছে। ওয়াশিংটনের ত্রাণ তৎপরতা তদারকির জন্য মার্কিন সামরিক বাহিন্যের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্যারাকাসে পৌঁছেছেন।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট: ভূমিকম্পটি এমন সময়ে এল যখন দেশটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট ও সেবাবঞ্চনার মধ্যে রয়েছে। স্বাস্থ্যনীতি ও হাসপাতালগুলো দুর্বল হওয়ায় বড় ধরনের আঘাত মোকাবিলা করা কঠিন হয়েছে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, ভূমিকম্পের আগেই লাখো মানুষ খাদ্যসংকট ও মৌলিক সেবার অভাবে ভুগছিল; আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা বাড়াতে হবে যাতে এটি আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ না নেয়।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও মৃত-নিখোঁজের মধ্যে বিদেশি নাগরিক: সরকারি ও কূটনীতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন—২৮ জন পর্তুগিজ, পাঁচজন স্প্যানিশ, দুইজন ব্রাজিলীয়, সাতজন চীনা, একজন চিলিয়ান এবং একজন দ্বৈত নাগরিক (ইতালীয়-ভেনেজুয়েলা)। আরও রয়েছে বিপুল সংখ্যক নিখোঁজের তালিকা; উদাহরণস্বরূপ পর্তুগিজরা জানিয়েছে ৮৫ জন তাদের নাগরিক নিখোঁজ বা অবস্থান অজানা, আর স্পেন ১১৯ জনকে নিখোঁজ হিসেবে দেখাচ্ছে।
মানবিক শ্রদ্ধা ও অবশিষ্ট কাজ: এই বিপর্যয়ের স্মরণে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো শুরুর আগে শোকানুধ্যায়ী এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, সামনে এখনও মহাপর্যায়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো, আহতদের চিকিৎসা ও অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, এবং মরণশয্যায় থাকা লোকদের কাছে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়রা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো জরুরি ভিত্তিতে ভারী যন্ত্রপাতি, চিকিৎসাসামগ্রী, ত্রাণ ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র দ্রুত পাঠানোর আবেদন জানাচ্ছে।













