ঢাকা | শনিবার | ৩০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৩ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

কোরবানির ঈদে অভ্যন্তরীণ বাজারে সম্ভাব্য ৩–৪ লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য

কোরবানির ঈদ এখন শুধু ধর্মীয় উৎসবই নয় — দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অন্যতম বড় মরসুমেও পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধাক ও ব্যবসায়ীদের অনুমান অনুযায়ী ২০২৬ সালে কোরবানির পশু ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের কারণে দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি থেকে চার লাখ কোটি টাকার বাণিজ্যিক লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি জানিয়েছে, ‘‘কোরবানির ঈদ দেশের সবচেয়ে বড় মৌসুমি বাজারগুলোর এক’’.

এই বিপুল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বড় অংশ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। লাখো ক্ষুদ্র খামারি ও গবাদি পশু পালনকারীর জন্য এটিই বছরের প্রধান ইনকামের উৎস। মাঠশহর সর্বত্র পশুর হাট জমে ওঠে — আল্লাহর নাম করে পশু বিক্রি, ক্রেতা-বিক্রেতার উৎফুল্ল ভিড় এবং পরিবহনে লোকবলদের বাড়তি আয় দেখা যায়।

পশু ব্যবসাই এই বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে বলা হচ্ছে, এ বছর প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ পশু প্রস্তুত রয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। যদি গড় বিক্রয়মূল্য প্রতি পশু ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ধরা হয়, তাহলে শুধু পশু বিক্রয় থেকেই এক লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতে পারে।

পশু বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে পশুখাদ্য, ওষুধ, টিকা, খামার সরঞ্জামাদি ও পশুচিকিৎসা সেবার চাহিদাও তুঙ্গে ওঠে। এছাড়া পশু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মাংস সংরক্ষণ ও পরিবহনের কারণে রেফ্রিজারেটর ও ডিপ ফ্রিজের বাজার জোড়ালো হয় — ফলে ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারীরা বিশেষ কিস্তি ও ছাড় দিচ্ছে।

কোরবানির আরেকটি শক্তিশালী খাত হলো পোশাক ও ফ্যাশন। ধারণা করা হচ্ছে, এক ঈদেই ফ্যাশন ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যে প্রায় ৮০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ কোটি টাকার লেনদেন হবে। লোকসানের মধ্যে থাকা ছোট দোকানগুলোও এই সময় বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় সচ্চল থাকে। পরিবহন খাতও চাঙ্গা হয় — উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে পশু আনা হয়, যা চালক ও শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত আয় তৈরি করে।

ভৌগোলিকভাবে দেশের মোট ঈদ বাণিজ্যের প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশই ঢাকা মহানগরে কেন্দ্রভূমি করে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক এক লাখ কোটি থেকে এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থাকতে পারে।

ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোরও এই মৌসুমে চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। দা-ছুরি, চাপাতি, বঁটি, চাটাই ও স্থানীয় কামারশালাগুলো বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। জাতীয় পরিসরে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় সংখ্যায় রেকর্ড না থাকলেও বাস্তবে হাজার হাজার নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য এটি মৌসুমি আয় ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

ডিজিটাল অর্থনীতিও কোরবানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়েছে। অনলাইন পশুর হাট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মকে দিয়ে লেনদেন বেশি নিরাপদ ও স্বচ্ছ হচ্ছে, ফলে অনেক বিক্রেতা ও ক্রেতা অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করছেন।

তবে চামড়া শিল্পের চিত্রটি প্রশ্নবোধক রয়ে গেছে। একসময় রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই খাতটি দুর্বল সংরক্ষণ ও আধুনিক ট্যানারি ব্যবস্থার অভাবে কাঙ্খিত ফল দিচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপযুক্ত নীতিসহ আধুনিক সরবরাহ ও মূল্যসংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে চামড়া শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সামগ্রিকভাবে কোরবানির ঈদ দেশের গ্রামীণ আয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মৌসুমি কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনকে এক সঙ্গে সক্রিয় করে। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগ থাকলে এই মৌসুমি বাণিজ্য জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তভাবে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে।