ঢাকা | রবিবার | ২৬শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৯ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ইরানকে ঘিরে মার্কিন নৌঅবরোধ — ভবিষ্যৎ কেমন?

গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দরগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নৌঅবরোধ শুরু করে। শুরুতেই হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানীয় পতাকাবাহী এক ট্যাংকারে গুলি চালিয়ে সেটি জব্দ করা হয়; তারপর গভীর সমুদ্রে ইরানগামী বা ইরান থেকে আসা জাহাজগুলোর পথ বদলানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ইরান তার সশস্ত্র বাহিনীর মুখে এ ঘটনাকে ‘জলদস্যুতার শামিল’ ও ‘বেআইনি কাজ’ আখ্যা দিয়েছে।

মার্কিন এই নৌঅবরোধের জবাবে তেহরান সব বিদেশি জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং কয়েকটি বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজও জব্দ করে। এর আগে ইরান শুধু ‘বন্ধুভাবাপন্ন’ দেশে থাকা জাহাজগুলোকে ওই পথে চলার অনুমোদন দিত।

ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ ১৯ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিনা মূল্যে মেলে না।” তার ভাষ্য, একদিকে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করা হবে আর অন্যদিকে সবাই বিনা মূল্যে নিরাপত্তার দাবি করবে—এমনটা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, পছন্দ দুইভাবে স্পষ্ট: বা তো তেলবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, বা সবার জন্য বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি থাকবে।

এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুদ্ধবিরতি আলোচনা–মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ তুলে নেওয়াই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পূর্বশর্ত। বিশ্লেষকরা বলছেন, অবরোধ ইরানের ওপর ক্ষতিসাধন করলেও দেশটির কাছে পরিস্থিতি সামাল দেবার যথেষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব কেমন?

ইরান সমুদ্রপথে তেল, গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্যসহ নানা পণ্য রপ্তানি করে। বিশ্লেষকদের মতে হরমুজ প্রণালী ও ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ এই বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ে। এরপর থেকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রধানত ইরানের হাতে চলে আসে, যদিও তারা স্বনির্ভরভাবে ওই পথে নিজেদের জ্বালানি পণ্য রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে যায়। বাণিজ্য ও তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার মতে, ইরান গত মার্চে গড়ে দিনে 1.84 মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে; এপ্রিলে এ পর্যন্ত গড়ে 1.71 মিলিয়ন ব্যারেল। ২০২৫ সালের গড় রপ্তানি ছিল দিনে 1.68 মিলিয়ন ব্যারেল।

১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান 55.22 মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। গত এক মাসে তাদের প্রধান তিন ধরণের তেলের দাম কখনও ব্যারেলপ্রতি 90 ডলারের নিচে নামেনি এবং বহু সময় 100 ডলারও ছাড়িয়েছে। এমন মূল্য ধরে রাখলে চলমান রপ্তানি থেকে গত এক মাসে ইরান অন্তত 4.97 বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। তুলনামূলকভাবে যুদ্ধ শুরুর আগের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইরান দিনে প্রায় 115 মিলিয়ন ডলার আয় করত, অর্থাৎ মাসিক আয়ের দাঁড়াতে 3.45 বিলিয়ন ডলার। সহজ করে বললে, যুদ্ধ শুরুর পরের ওই এক মাসে তেল রপ্তানি থেকে ইরান প্রায় 40 শতাংশ বেশি আয় করেছে—এটাই মার্কিন অবরোধের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি বন্ধ করা।

বিশ্লেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার ১৪ এপ্রিল আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, গত ছয় সপ্তাহে তেল রাজস্বের দিক থেকে ইরান লাভবান হয়েছে, তবে মার্কিন অবরোধ পরিস্থিতি পাল্টিয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কতদিন অবরোধ চালিয়ে রাখতে পারবে?

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন এই অবরোধ অব্যাহত রাখতে পারবে কি না। স্নাইডারের বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ১ মে ট্রাম্পের ওপর একটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে—কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য তার হাতে থাকা ৬০ দিনের সময়সীমা ওই দিন শেষ হবে।

তিনি আরও বলেন, যেসব জাহাজের মাধ্যমে অবরোধ কার্যকর রাখা হচ্ছে, সেগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। বিশেষত যদি চীনের মালবাহী জাহাজগুলোকে বারবার জব্দ করা হয়, তাহলে চীন কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা নজরদারি করতে হবে। চীন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তাদের ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে এই ধরনের অবরোধ গ্রহণযোগ্য নয়।

বাহরাইনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যাডাম এরেলি আল জাজিরার ‘দিস ইজ আমেরিকা’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ইরানিরা এই পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তাদের নিজের পরিকল্পনা এবং বিকল্প উপায় আছে। এমনকি তাদের তেল ফুরিয়ে গেলেও, এই কঠোর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে থাকার পথ তাদের জানা আছে।’ তার মতে, ট্রাম্প ও আমেরিকান জনমতের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলেও ইরান টিকে থাকবে।

অবশেষে দুই পক্ষের আচরণ থেকে যে ছাপ পাওয়া যায়, তা হলো—ইরান ধৈর্য প্রদর্শন করছে, আর মার্কিন দিক ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কীভাবে এগোবে তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং অবরোধের বাস্তব মধ্যস্থতামূলক সীমাবদ্ধতার উপর।