ঢাকা | রবিবার | ৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২০শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

জুলাইয়ের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয় — এটি দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রপ্রেমী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের অর্জন। যারা জীবন্ত দিয়েছে, তাদের আত্মত্যাগকে সরকার সর্বোচ্চভাবে মূল্যায়ন করবে এবং আইন অনুযায়ী অন্যায়কারী ও হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। বিচারকরণের ফলে যেন কারও প্রতি অন্যায় না ঘটে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধানমন্ত্রীর এসব কথা বলেন। সম্মেলনে শহীদ ও আহতদের সঠিক মূল্যায়ন ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন সরকারী দায়িত্ব বলে তিনি জোর দেন।

শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তাদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ‘‘আপনাদের কষ্ট আমি বুঝি—শারীরিকভাবে যে কষ্ট হয়েছে, মানসিকভাবে যে ব্যথা আছে, সেটি আমি অনুভব করতে পারি,’’ তিনি বলেন।

অনুষ্ঠানে তিনি ব্যক্তিগত আবেগও প্রকাশ করেন। বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে যদি আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতাম—আপনার ওপর যে অন্যায় হয়েছে, আপনি কি মেরাই চাইবেন? আমার বিশ্বাস মা বলতেন, তোমার কাজ হবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। আমার ভাইকেও জিজ্ঞেস করলে তিনিও সমান উত্তর দিতেন।’’

প্রধানমন্ত্রী আহত ও নিহতদের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্যপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু শহীদ হয়েছিল; তাদের কোনো অপরাধ ছিল না। সরকারি গেজেটে প্রকাশিত শহীদ তালিকায় ৮৩৪ জনের নাম থাকলেও জাতিসংঘের তদন্তে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। তিনি নিজে বিভিন্ন সূত্রে গণনা করে বলছেন, শুধু জুলাই আন্দোলনে প্রায় ২ হাজার মানুষ শহীদ হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন — এগুলো তাঁর ব্যক্তিগত অনুমান বলেও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্বৈরাচারের শাসনামলে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ঘটানো নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-হামলা অনস্বীকার্য। তিনি জনসাধারণকে আহ্বান জানিয়ে বলেন — যারা আপনজনকে হারিয়েছেন, তাদের ত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে তাদের লক্ষ্য এবং যেই ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্যে তারা লড়েছেন, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতিকে বিভক্ত করে দেশ অগ্রসর করা সম্ভব নয়; তাই ঐক্যবদ্ধভাবে এগোবার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

অনুষ্ঠানে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে তাদের যন্ত্রণা ও প্রত্যাশার কথা জানান। সকালে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করে অনুষ্ঠান শুরু হয়, এরপর শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়; জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনেই প্রধানমন্ত্রী শহীদ পরিবারের হাতে স্মৃতি স্মারক তুলে দেন।

এই সময় শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, আহত আল মিরাজ, জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত সব পরিবারের জন্য রাখা স্মৃতি স্মারক পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে স্মৃতি স্মারক উপহার দেওয়া হয়।

আলোচনা সভার সভাপতি ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির। আলোচনায় বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা, কওমী ছাত্র ফোরামের সভাপতি মাওলানা জামিল সিদ্দিকী, আয়োজনকারি সংগঠন ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সভাপতি আমিনুল ইসলাম ঈমন ও সাধারণ সম্পাদক আল মিরাজ, এবং জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’র সভাপতি গোলাম রহমান ও সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল।

অনুষ্ঠানে বহু শহীদ পরিবারের সদস্য স্মৃতিচারণ করেন—শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেইন, শহীদ শাহরিয়ার হোসেন আলভীর বাবা আবুল হোসেন, শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম ও যাত্রাবাড়ীর শহীদ মিরাজের বাবা আবদুর রব মিয়া। পাশাপাশি আহতরা—শাহিন মালু, সুজন মোল্লা, মিল্লাত হোসেন, আল-আমীন, মেহেদি হাসান মিরাজও তাদের অভিজ্ঞতা ও কষ্টের কথা বলেন।

জুলাই জাতীয় সম্মেলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন রক্তাক্তভাবে শেষ হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তা সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পরে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। সরকারের প্রকাশিত গেজেটভিত্তিক তালিকায় নিহতের সংখ্যা ৮৩৪ উল্লেখ থাকলেও বিভিন্ন তদন্তে ও হিসাব-নিকাশে এই সংখ্যাকে কেন্দ্র করে ভিন্নতা থেকে গেছে।

সম্মেলনের আয়োজন করেন জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি; এতে শতাধিক শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁদের দাবি ও প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান থেকে প্রতিজ্ঞা করে বলেন—শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই হবে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রধান কাজ।