ঢাকা | সোমবার | ২৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট-কর শিথিল, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন প্রস্তাব প্রত্যাহার

সরকার খুচরা দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কঠোর করব্যবস্থা আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার বা শিথিলের সংকেত দিয়েছে। দেশের এসএমই খাতে নেতিবাচক প্রভাব ও খুচরা ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিবাদের পর আরও কিছু বিতর্কিত করবিধান পেছিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো জাতীয় সংসদে নতুন অর্থ বিল ‘অর্থ আইন’ পাসের আগে সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬-এ আনা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে জুনের পর পরই ১ জুলাই থেকে টার্নওভারের পরিমাণ নির্বিশেষে সব খুচরা ব্যবসাকে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার কথা ছিল। চলমান আইন অনুযায়ী বছরে ৫০ লাখ টাকা বা তার বেশি টার্নওভার থাকলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং এর নিচের প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকে। এই নতুন প্রস্তাবের কারণে দেশের খুচরা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন; তারা বলেছিলেন, এতে পরিচালন ব্যয় বাড়বে এবং মাঠপর্যায়ের ভ্যাট কর্মকর্তাদের হয়রানির ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

এমন পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশ্লিষ্ট বিধানটি অর্থ বিল পাসের আগেই বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বলেছে, মাঠপর্যায়ে এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জটিল হবে এবং অনেক মাঝারি প্রতিষ্ঠানি প্যাকেজ ভ্যাট সুবিধা ভোগ করে করফাঁকির চেষ্টা করতে পারে — এসব কারণ মাথায় রেখে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার বাইরে রাখা হয়নি, বরং সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখার জোর দাবি জানিয়ে আসছিল। সংগঠনের সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসীর কাছে ভ্যাট আদায় করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই; এই নিয়ম চালু হলে হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হতেন এবং এসএমই খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতো।

দোকান মালিকদের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরে আদায়কৃত মোট ভ্যাটের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে মাত্র ১০৯টি বড় করদাতা ইউনিট থেকে, যা গত অর্থবছরে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার সংগ্রহের বড় অংশ গঠন করেছে। ফলে সংগঠনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-কে খুচরা দোকানদারদের হয়রানি না করে ভ্যাট অটোমেশন দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বড় বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি জোরদার করার অনুরোধ করেছে।

অর্থবিলে আরও কয়েকটি সংশোধনও চূড়ান্ত সম্ভাব্যতার মধ্যে রয়েছে। তামাকখাতে আমদানি পর্যায়ে নিকোটিন পাউচসহ কিছু পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক বৃদ্ধির ধারাটি প্রত্যাহার করে বিদ্যমান ৩৫ শতাংশকে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে; পাশাপাশি সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধি থেকেও সরে আসার ইঙ্গিত মিলেছে। অন্যদিকে ভূমির মালিকদের জন্য প্রস্তাবিত মূলধনী মুনাফা কর বা গেইন ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে সম্ভবত ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও চূড়ান্ত অর্থ বিলে অন্তর্ভুক্তির পর্যায়ে রয়েছে।

সরকারের এই মৃদু শর্তসাপেক্ষ পশ্চাৎপদ আর কৃষ্ণচূড়া সদৃশ বিচারের ফলে করনীতি সৌজন্যমূলকভাবে সংশোধন করা হচ্ছে বলে ব্যবসায়ী মহল থেকে স্বস্তির শ্বাস ফেলা যাচ্ছে। তবে অর্থমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি— বড় করদাতাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং ভ্যাট সংগ্রহ ব্যবস্থার অটোমেশন নিশ্চিত করা হবে, যাতে রাজস্ব ক্ষতি ছাড়াই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ না পড়ে।