ঢাকা | মঙ্গলবার | ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১লা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

জাপান যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৮ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করবে: নতুন যুগের দিগন্ত দাবি স্টারমারের

যুক্তরাজ্য ও জাপানের মধ্যে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের একটি বৃহৎ ও কৌশলগত বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির অধীনে জাপানের বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো, আর্থিক সেবা, সমুদ্র উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের পুঁজি ব্যয় করবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই চুক্তিকে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ‘‘নতুন এক যুগ’’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ উদ্যোগ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে।

লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট সূত্রে বলা হয়েছে, জাপানি কোম্পানিগুলো যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো ও আর্থিক খাতে ৯ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ করবে এবং সমুদ্র উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতে প্রায় আরও ৯ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই প্যাকেজের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। ব্রিটিশ সরকার আশা করছে, এই বিনিয়োগ আগামী কয়েক বছরে দেশজুড়ে প্রায় ১০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে।

এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় লন্ডনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর স্টারমার বক্তব্য দেন। পরে দুই নেতাই জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন এবং স্টারমার বৈঠকগুলোকে ‘‘খুবই ফলপ্রসূ’’ বলে অভিহিত করেন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত অর্থের সবটাই সম্পূর্ণ নতুন অবদান নাও হতে পারে; এর একটি অংশ আগে ঘোষিত বা চলমান প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা হতে পারে। তবুও এমন এক বড় চুক্তি ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে যখন দেশটি বৈশ্বিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যের জিডিপি জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে ০.৬ শতাংশ ব্যয়ে শীর্ষস্থান অর্জন করলেও অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ব্রিটিশ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে—এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)ও সতর্কতম প্রতীয়মান হয়েছে—তবুও তারা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের পুনরুজ্জীবনে আশাবাদী এবং আগামী বছরে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে দেশটি দ্রুতগতিতে ফিরে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছে।

বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতেও গভীর সহযোগিতার বিষয় আলোচিত হয়েছে। ইতালির সঙ্গে বাস্তবায়িত ‘জিসিএপি’ যুদ্ধবিমান প্রকল্পে উভয় দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান রোলস-রয়েস জাপানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তি আবিষ্কারে অংশ নেবে। একটি নতুন প্রযুক্তি সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তি এবং জাপানের শক্তিশালী উৎপাদন খাতকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। জাপানের প্রধানিও এই অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “যুক্তরাজ্য জাপানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।”

চুক্তির বিশদ অনুযায়ী, মিতসুবিশি এস্টেট, মিতসুই ফুডোসান ও নোমুরা রিয়েল এস্টেটের মতো জাপানি ব্যবসায়িক জায়ান্টগুলো আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যের রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো খাতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে।

বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে লেবার সরকারের কিছু নীতি নিয়ে তারা সমালোচনা করছে। ছায়া বাণিজ্যমন্ত্রী অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ বলেছেন, তারা যে কোনো বিনিয়োগ-বান্ধব উদ্যোগকে সমর্থন করবে, কিন্তু অতিরিক্ত কর বা প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসায় ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগও রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে এই চুক্তিকে বিশ্লেষকরা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে পুনরুজ্জীবন আনার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে।