ঢাকা | সোমবার | ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে মাসখানেক ধরেই নিপীড়িত যুদ্ধ থামাতে এবং বিশ্ব অর্থনীতি সচল করতে এক যুগান্তকারী মুহূর্তে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজকালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাব্যতা প্রকাশ পেয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার (১৩ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, চুক্তি চূড়ান্ত হলে তা হতে পারে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি চুক্তিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা চলতি দশকের বৃহৎ কূটনৈতিক সাফল্যের মধ্যে গণ্য হবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটলে এটি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথ সুগম করবে এবং জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়

পাকিস্তান এই আলোচনায় নেপথ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে বলে সকল দিকে থেকে স্বীকৃতি পাওয়া যাচ্ছে। শাহবাজ শরিফের ঘোষণার পরেই দ্রুতভাবে বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে শুরু করেছে; তাতে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে প্রস্তুতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

দুই ধাপে শান্তি প্রক্রিয়া

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রক্রিয়াটি দুই ধাপে ভাগ করে তুলে ধরেছেন। প্রথম ধাপে — আগামী এক থেকে দু’দিনের মধ্যে — ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হবে। এই প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে “ফ্রিজ” করা ইরানের আর্থিক সম্পদগুলো একযোগে মুক্তি পাওয়া শুরু করবে বলে জানানো হয়েছে।

তত্পরতাবশত: উভয় পক্ষ প্রথম ধাপের সই ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল স্বাক্ষর পদ্ধতিতে করবেন এবং এরপর কারিগরি ও কৌশলগত পর্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে। দ্বিতীয় ধাপ প্রায় ৬০ দিন স্থায়ী হবে; সেই সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি চালু করার লক্ষ্যে উভয় পক্ষ টেবিলে বসবে এবং নানান খোলামেলা বিষয় চূড়ান্ত করা হবে। ইফ যে ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভব নাৎস, তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে যে পরিস্থিতি আবার পুরনো সংঘাতকালে ফিরে যেতে পারে।

পারমাণবিক বিষয় ও ইউরেনিয়াম

আরাগচি জানান, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং সার্বিক পারমাণবিক ইস্যুটি প্রথম ধাপ থেকে সরিয়ে দ্বিতীয় ধাপে আলোচনা করা হবে। ইরান স্পষ্ট করেছেন, তারা অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠাবে না; বরং দেশিভিত্তিকভাবে তা তরলীকরণ করে রাখবে। আমেরিকান পক্ষের কিছু দাবি থাকলেও ইরান তাদের অবস্থানে অনড় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।

নৌঅবরোধ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন

চুক্তির শর্ত হিসেবে উল্লেখ আছে যে আমেরিকার দ্বারা আরোপিত নৌঅবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। তেহরান বলছে, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি বড় মানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্যাকেজ থাকবে; এতে ইরানের অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক তহবিলের প্রবাহ আসার কথা রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ইতিহাসে বিরলভাবে মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সার্বভৌমত্বের দিকে সম্মান প্রদর্শন করবে—এমন ধারণাও প্রকাশ পেয়েছে।

হরমুজ প্রণালী ও লেবানন সম্পর্কিত সমাধান

খসড়া চুক্তির আলোকে হরমুজ প্রণালীকে নিরাপদ ও নিবিড়ভাবে সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইরান ও ওমান যৌথভাবে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পরিচালনার একটি নতুন আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো ঘোষণা করবে। একই সঙ্গে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে সামগ্রিক যুদ্ধবিরতির শর্ত রেখে অঞ্চলভিত্তিক নতুন সমীকরণ তৈরি করা হবে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠানো না হওয়া পর্যন্ত প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সতর্ক অবস্থায় থাকবে বলে জানা গেছে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

চুক্তির সম্ভাব্য ঘোষণা ইসরায়েলে তীব্র উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু খেয়াল প্রকাশ করেছেন এবং ইসরায়েলি শিবিরে এতে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবানন সীমান্তে তত্ত্বাবধান এবং ইরানের বিরুদ্ধে পূর্বের রণকৌশল পরিবর্তন হলে তা নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে—বিশেষ করে নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে। তাই চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত ইসরায়েল মাঠে যথাসম্ভব কৌশলগত সুবিধা বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে।

উৎস ও প্রত্যাশা

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও রয়টার্স দ্বারা উঠে এসেছে। সব পক্ষই বলছে—এই চুক্তি সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি শক্ত ভিত্তি দিতে পারে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য রয়েছে বহু প্রযুক্তিগত, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ; তাই আগামী কয়েক সপ্তাহকে এ প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত নির্ধারণী বলা হচ্ছে।