নারী ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেছেন, দেশে নারী ও শিশুদের অধিকার সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী আইন থাকলেও সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সামাজিক মনোভাব বদলাতে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে—এটাই এখন প্রধান কাজ। তিনি বলেন, মাদক ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দেশের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নীতিমালা, নানা আইনি বিধান ও এডভোকেসি কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও মামলা দায়ের, তদন্ত ও ডাক্তারি পরীক্ষায় বিলম্ব, অপর্যাপ্ত প্রমাণ এবং সাক্ষীর অভাব—এসব কারণে লিঙ্গভিত্তিক যৌন সহিংসতার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রচলিত আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক অস্থিরতার ফলে মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা ধীরে ধীরে ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং অপরাধ প্রবণতাও বেড়েই চলেছে।
তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যমান আইনগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
অতিথিবৃন্দও নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে আইন প্রয়োগের গুরুত্ব এবং সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ উল্লেখ করেন যে, সংবিধান নারী-পুরুষ সমান অধিকার নিশ্চিত করলেও বাস্তবে কিছু বিধান প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। তিনি নারী নির্যাতন ও ধর্ষণসহ যুগোপযোগী অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনগুলোর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মানবিক শিক্ষা ও নৈতিকতার শুরু পরিবার থেকেই। তাই পরিবারগুলোতে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। তিনি সাইবার বুলিং রোধে কার্যকর নজরদারি, কনটেন্ট নির্মাতা ও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংলাপ বাড়ানো এবং ধর্মীয় নেতাবৃন্দ ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, রামিসা হত্যার মতো মামলা সমাজের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো উন্মোচন করে। তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সরকার ও সমাজের মধ্যে সহযোগিতা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম বলেন, সচেতনতামূলক প্রচারণা, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক পুলিশিং নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি প্রত্যেক জেলায় ভুক্তভোগী সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন এবং সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।
উপস্থিত বক্তারা একভাবে বলেছেন—আইনের সঠিক বাস্তবায়ন, দ্রুত ও মনোযোগী বিচারপ্রক্রিয়া, সমাজে শিক্ষাবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং সরকারি-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নারী ও শিশুদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।













