ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের তৎপরতায় আমিরাত ও ইসরায়েলের দূরত্ব কমে এসেছে। বর্তমান ও সাবেক দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে লন্ডনভিত্তিক মিডিয়া মাধ্যম মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, দুই দেশ যৌথভাবে নতুন অস্ত্রব্যবস্থা কেনা ও উন্নয়নের জন্য একটি তহবিল গঠন করেছে।
একজন বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের আওতায় তারা যৌথভাবে অস্ত্রব্যবস্থা অধিগ্রহণ করবে।’’ তিনি যোগ করেন, আমিরাত ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অর্থায়ন করতে পারে।
সূত্রগুলো জানিয়েছেন, চুক্তির মসৌদা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আরব আমিরাত সফরের সময়ই চূড়ান্ত হয়। নেতানিয়াহুর দপ্তর সফর সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিলেও আবুধাবি তা অস্বীকার করেছে। ওয়াশিংটনে আমিরাত ও ইসরায়েলীয় দূতাবাস মিডল ইস্ট আই-এর মন্তব্য অনুরোধের জবাবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত কোনো উত্তর দেয়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, দুই দেশ বিশেষ করে কাউন্টার-আনম্যান্ড এয়ারক্রাফট সিস্টেমস (সি-ইউএএস) এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা ও উন্নয়নে যৌথভাবে বিনিয়োগ করতে চায়। সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তহবিলে ‘যথেষ্ট অর্থ’ রাখা হয়েছে এবং কেনাকাটা সম্ভবত কেবল আকাশ প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তেল আবিবভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের শীর্ষ গবেষক ও উপসাগরীয় রাজনীতি বিশ্লেষক ইয়েল গুজানস্কি বলেন, ‘‘আমিরাত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন ইতিহাসে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অবস্থানে এসেছে। কোনো আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের এতটা নিবিড় সহযোগিতা আগে দেখা যায়নি।’’
ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল সংকটের জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে লক্ষাধিক হামলা চালায়; জালিয়াতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতের দিকে প্রায় ৩ হাজার ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ঘটনার সময় ইসরায়েল আমিরাতে আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি ও সেটি পরিচালনার জনবল মোতায়েন করে; এ তথ্য মে মাসে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি নিশ্চিত করেছেন।
গুজানস্কি বলছেন, ‘‘অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যৌথ তহবিল গঠন তাদের জন্য যৌক্তিক পরবর্তী পদক্ষেপ। ইসরায়েলের কাছে প্রযুক্তি আছে, কিন্তু সীমিত সম্পদ; আমিরাতের কাছে অর্থ রয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কম।’’
তবে যৌথ প্রতিরক্ষা কেনাকাটা সবসময় সহজ নয়। রাশিয়া-ভিত্তিক নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলতে ইউরোপীয় কয়েকটি দেশও এমন ধরনের যৌথ তহবিল গঠনের চেষ্টা করেছে, কিন্তু নানা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে। আমিরাতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন: দেশটি একটি পূর্ণ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীয়, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রকাশ করে না। কয়েকটি হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালে আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে, যা দেশের জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ ধারণা করা হচ্ছে।
কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সূত্রে বলা হয়েছে, ইরানের হামলার পরে উপসাগরীয় সব দেশেই প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর ইচ্ছা দেখা দিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সাতটি আমিরাত নিয়ে গঠিত; এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনী আবুধাবি ফেডারেল সরকারের কেন্দ্রভিত্তি। আবুধাবির শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান রাষ্ট্রপতি; কেবল আবুধাবির সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে বলে বলা হয়, এবং দেশটির অধিকাংশ তেল মজুতও তাদের নিয়ন্ত্রণে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি মাসে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স খালেদ বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান প্রতিরক্ষাভিত্তিক একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠন নিয়ে মুবাদালা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
এই ঘনিষ্ঠতা নতুন কথাও নয়: ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস থেকেই আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরালো হতে শুরু করে, এবং সমর্থকরা তখন থেকেই বলছেন যে এর বড় সুফল হবে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গভীরতা। ২০২৫ সালের জুনে আমিরাতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এজ গ্রুপ ইসরায়েলের থার্ডআই সিস্টেমসের ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়; প্রতিষ্ঠানটি ড্রোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বার্নার্ড হাইকল এই পদক্ষেপকে বলছেন পূর্বের প্রতিরক্ষা সমঝোতাগুলোরই ধারাবাহিকতা ও ‘‘দুই পক্ষের জন্য যৌক্তিক’’ একটি এগোচ্ছে।
সংক্ষেপে, ইরানীয় হামলা উপসাগরীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণকে বদলে দিয়েছে; ফলে আমিরাত ও ইসরায়েল কৌশলগতভাবে একে অপরের দিকে ঝুঁকছে—ইসরায়েল প্রযুক্তি দেবে, আমিরাত অর্থ ও অবকাঠামো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই যৌথতা কবে, কীভাবে বাস্তবে রূপ নেবে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতির ওপরই নির্ভর করবে।













