ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে: ইগর থিয়াগোর বিস্ময়কর উত্থান

ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে দরিদ্র্যকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে তীর্যক হয়ে ওঠার গল্প বহু আগে থেকেই আছে। তবু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের স্কোয়াডে জায়গা করে নেয়া ইগর থিয়াগোর জীবনকাহিনী সেগুলোকেও হার মানাতে পারে। মাত্র ২৪ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার যখন কার্লো আনচেলত্তির ২৬ জনের চূড়ান্ত দলে সুযোগ পেলেন, তখন পুরো বিশ্ব দেখল ব্রাসিলিয়ার এক উপশহর থেকে উঠে আসা এক লড়াকু তরুণের অনাকাঙ্ক্ষিত উত্থান। শৈশবে চরম অভাব, বাবার অকাল মৃত্যু ও রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ—এসব কষ্টকে পেছনে রেখে আজ তিনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের ভরসা হয়ে বিশ্বমঞ্চে পা রাখছেন।

ইগরের শৈশব কেটেছে ব্রাসিলিয়ার উপশহর গামায় দারিদ্র্যের মধ্যে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবার আর্থিক সংকটের মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়। মায়ের নাম মারিয়া দিভা; সংসার চালাতে তিনি রাস্তায় ঝাড়ুদারের কাজ করেছেন। অভাবের তাড়নায় ইগর কিশোর বয়সেই রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন, সঙ্গে ফল বিক্রি ও লিফলেট বিলি—সে সময় ফুটবলই ছিল তার স্বপ্ন, কিন্তু বারবার ক্লাব ট্রায়ালে ব্যর্থতা তাকে একসময় খেলা ছেড়ে দেওয়ার প্রায় পথ দেখিয়েছিল। মায়ের অনুপ্রেরণা ও নিজের অনিবার্য পরিশ্রমই তাকে হাল ছেড়ে না দিতে বাধ্য করে।

ইগরের প্রতিভার প্রথম বড় ইঙ্গিত আসে ২০১৮ সালে, যখন অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি ১৩ গোল করেন। এর পরে তিনি যোগ দেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ক্রুজেইরোতে, কিন্তু ক্লাবটিতে যে আর্থিক সংকট দেখা দেয় তা ইগরের কেরিয়ারের জন্য কঠিন সময় এনে দেয়। তীব্র সমালোচনার মধ্যেই কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও যখন ক্লাবটির মালিক হন, তিনি ইগরের ওপর বিশ্বাস রাখেন এবং তাকে বিক্রি করে দেন ৭ লাখ ডলারে বুলগেরিয়ার ক্লাব লুদোগোরেতসের কাছে।

ইউরোপে পা রাখা ইগরের জীবনের পরে বড় মোড়—লুদোগোরেতসে সুচারুরূপে খেলার পরে তিনি বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুগেতে যোগ দিয়ে এক মৌসুমে ২৯ গোল করে সবাইকে চমকে দেন। ইউরোপের সফলতা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই তাকে আরও বড় মঞ্চের দিকে নিয়ে যায়।

২০২৪ সালে ব্রেন্টফোর্ড তাকে প্রিমিয়ার লিগে নিয়ে আসে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের রেকর্ড ফিতে। ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর কিন্তু ভাগ্য যেন কাঁটা ফেলে—এক বিরল জয়েন্ট ইনফেকশন ও হাঁটুর চোটের কারণে তিনি ২৭৩ দিন ধরে মাঠের বাইরে ছিলেন। তবুও ইগর হার মানেননি; কঠোর পুনর্বাসন ও মনোবল নিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে তিনি গ্র্যান্ড রিটার্ন করেন এবং প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে ২২ গোল করে সেটি এক ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ের জন্য এক মৌসুমের সর্বোচ্চ রেকর্ডে পরিণত করেন। তাঁর পারফরম্যান্সে আর্লিং হালান্ডকেও টপকে তিনি মাসসেরা খেলোয়াড়ের খেতাব জেতেন। জাতীয় দলের গিয়ে গত মার্চে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করা গোলটি ছিল তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের এক প্রকাশ্য স্বীকৃতি।

৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার ইগর থিয়াগো এখন ক্লাসিক ‘নম্বর নয়’ হিসেবে পরিচিত। এয়ারিয়াল বলের আধিপত্য, শক্তিগর দেহভঙ্গি এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণভেদ করে গোল করার ক্ষমতা তাকে আনচেলত্তির পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ কড়ি বানিয়েছে। যারা একসময় তার সামর্থ্যকে অবহেলা করত, আজ তারা ইগরের বিশ্বজয়ের অপেক্ষায়।

রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে শুরু করে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ওঠা এই তরুণ কেবল নিজের মেধা ও অদম্য বিশ্বাসের জোরে কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি কী করে ব্রাজিলকে এগিয়ে নিয়ে যান—ব্যাপারটা এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর কাড়ছে।