ঢাকা | বুধবার | ১৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১লা সফর, ১৪৪৮ হিজরি

আসন্ন কাউন্সিলকে সামনে রেখে বিএনপিতে ব্যাপক পুনর্গঠন শুরু

আসন্ন ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে দলকে সক্রিয়, আধুনিক ও সংগ্রামী করে তোলার উদ্দেশ্যে বিএনপি সম্প্রতি ব্যাপক পুনর্গঠন কর্মসূচি শুরু করেছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দল গোছানোর এই চূড়ান্ত পদক্ষেপে ছাত্র, যুব, স্বেচ্ছাসেবক, কৃষক, মহিলা ও শ্রমিকসহ সব অঙ্গসংগঠনের নতুন ঘাঁটি সাজানো হচ্ছে।

পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য — দীর্ঘ দিনের স্থবিরতা ভাঙা, তৃণমূলকে শক্তিশালী করে রাজপথে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে বিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারা। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বদলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির কাজ চলছে।

দলের শীর্ষ পর্যায়ের এবারের পরিকল্পনা তৃণমূল-কেন্দ্রিক: যারা মাঠে ছিলেন, ত্যাগী ও প্রবৃদ্ধিশীল কর্মীরা অগ্রাধিকার পাবে। একই সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় যে ইউনিটগুলো আছে সেগুলোকে নতুন করে গঠন করে তোলা হবে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিলের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনও চূড়ান্ত নয়; তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

বিগত সপ্তাহে বিএনপি নেতা তারেক রহমান বিভিন্ন অঙ্গ ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার নির্দেশ দিয়েছেন। সভায় তিনি শৃঙ্খলা রক্ষা, তৃণমূলকে শক্তিশালী করা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মনোগড় করার ওপর জোর দেন। এছাড়া অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহযোগিতার প্রস্তুতির কথাও তিনি নিশ্চিত করছেন।

দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আরও বৈঠক চলবে। জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার পর ঢাকা মহানগর উত্তরসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের সঙ্গেও তারেক রহমান বৈঠক করার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর কর্মসূচি দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও সমানতালে চলমান রয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয়েছে। এখন কেন্দ্র থেকে তৃণমূল গোছানো হবে। তবে জাতীয় কাউন্সিলের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত নির্ধারণ হয়নি।”

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, “বিএনপি একটি সুবিশাল রাজনৈতিক দল। তৃণমূলের কর্মীরাই আমাদের প্রাণ। দল গোছানোর কাজ চলমান প্রক্রিয়া। বিএনপিসহ অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সাংগঠনিক গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে।”

এই পুনর্গঠনের ধারায় প্রধান অঙ্গসংগঠনগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পদে রদবদলের হাওয়া বইছে—কোনো সময়েই ‘সুপার ফাইভ’ বা আংশিক কমিটি ঘোষণার ঘোষণা আসতে পারে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, মহিলা দল এবং মৎস্যজীবী দলও নতুন আংশিক কমিটি ঘোষণার অপেক্ষায় আছে।

সংগঠনের ভিতরকার বাস্তবতাও উদ্বেগজনক: বর্তমানে দলের ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের বেশিরভাগ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টির মেয়াদ অনেক আগে শেষ হয়েছে—কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও এক যুগ ধরে একই কমিটি বহাল রয়েছে। অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা সংসদে এমপি বা মন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ায় মাঠ স্তরের কর্মকাণ্ড সস্তবির হয়ে পড়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব গঠনে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

এই স্থবিরতা ভাঙার লক্ষ্যে চেয়ারম্যান তারেক রহমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। যারাই দীর্ঘদিন রাজপথে নিষ্ক্রিয় ছিলেন বা সুযোগসন্ধানী ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হবে না—এ বার্তা দলের উচ্চ পর্যায় থেকে পরিষ্কারভাবে দেয়া হয়েছে। এক স্থায়ী কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, “দল এখন কোনো আপসের নীতিতে নেই। যারা প্রতিকূল সময়েও দলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন, তারাই আগামী দিনে বিএনপির চালকের আসনে বসবেন।”

পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া গ্রাসমান হচ্ছে এবং প্রধান শহরগুলোর নেতারা তাদের প্রার্থিতা পাকা করতে মাঠে দৌড়ঝাঁপ ও লবিং শুরু করেছেন। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক যখন উপযুক্ত সময় মনে করবেন, তখনই নতুন কমিটি দেবেন।”

সংক্ষিপ্তভাবে, আসন্ন কাউন্সিলকে সামনে রেখে বিএনপি এখন পুরো দলকে সক্রিয় ও সংগঠিত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে—কাঠামো পরিবর্তন, নেতৃত্ব সদলবলে আনা এবং তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি তীব্র করা হচ্ছে।