মিয়ানমারে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পাঁচ বছর ব্যাপী সংঘর্ষে মোট এক লাখ ১১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি-র (আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা) তথ্য — এই হিসাব সংবাদ সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে বুধবার প্রকাশিত হয়েছে।
সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নোবেলজয়ী অং সান সুচির পরিচালিত গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের পর দেশের বড়anter শহরে দ্রুত বড় ধরনের গণবিক্ষোভ শুরু হয়। সেনাবাহিনী কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করলে বহু বিক্ষোভকারী নগর এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন এবং পরবর্তীতে একাধিক গণতন্ত্রপন্থি গেরিলা বাহিনী গঠন হয়। দেশটির বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোাষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যরাও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।
এসিএলইডি জানিয়েছে, সংঘাত পর্যবেক্ষণের জন্য প্রকাশিত সংবাদ ও রিপোর্ট থেকে তারা নিহতের সংখ্যা সংগ্রহ করে এই আঘাতসংকটের পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। সরকারি বা আনুষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান এই সংখ্যাকে নিশ্চিত করেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্ধদশক ধরে চলা এই ঐতিহ্যহীন সংকট এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতগুলোর মধ্যে একটি তে পরিণত হয়েছে।
সংঘাতে ভুক্তভোগী এক পরিবার—রাখাইনে এক বিমান হামলায় নিহত থেইন আয়ে নু’র স্বামীর ঘটনায় যিনি হতাশা ও ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের কষ্টের কোনো শেষ নেই। আমি সীমাহীন রাগ এবং ঘৃণায় ভরা। এখন আর বুঝে উঠতে পারি না কার প্রতি রাগ করা উচিত।’ তিনি যোগ করেন যে, তিনি কেবল নিজেকে নিয়তির হাতে ছেড়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টাই করতে পারেন।
সেনাপ্রধান মিং অং হ্লাইং অভ্যুত্থানের পর সামরিক ডিক্রিতে দেশটি শাসন কালে ছিলেন। গত এপ্রিলে তিনি সশস্ত্র বাহিনী থেকে পদত্যাগ করে বেসামরিক হিসেবে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছে এবং তা ‘প্রহসনমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন—অর্থাৎ এটি সেনাসমর্থিত শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা বলে মনে করা হয়। ওই নির্বাচনে অং সান সুচির দলকে অংশ দিতে দেওয়া হয়নি এবং বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন সীমান্ত অঞ্চলে ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের ভেতরেই প্রায় ৩৭ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং প্রায় প্রত্যেক পাঁচ জনের মধ্যে এক জন খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে। দেশটিতে দারিদ্র্য প্রতি বছর বাড়ছে এবং মানবিক পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
দেশের সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গონში বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতার ঘটনা ঘটে চললেও বৃহৎ আকারে সংঘর্ষ দেশটির অন্যখানে চলছে। অনেক অঞ্চলে সেনাবাহিনী প্রতিদিনের মতো বিমান হামলায় জড়িত—এটি পরিচালিত হচ্ছে মূলত রাশিয়া ও চীন থেকে প্রাপ্ত যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে বলেই রিপোর্টগুলোতে বলা হয়েছে।
এসিএলইডি আরও জানিয়েছে, গত বছর সংঘাতের তীব্রতার দিক থেকে মিয়ানমারের অবস্থান ছিল ফিলিস্তিনি অঞ্চলের পরেই; এবং এর রণপরিকাঠামোতে এক হাজার দুইশোরও বেশি সশস্ত্র সংগঠন জড়িত। সংগঠনের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সান মন থান্ত বলেন, ‘এটা মারাত্মক এবং বেসামরিক মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংঘাতটি এখন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।’
মানবিক সহায়তা ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের অভাবে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও তাত্ক্ষণিক সাহায্য না এলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করছেন পর্যবেক্ষকরা।













