বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশের জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা কমাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরও সক্রিয় করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে স্থল ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে ধীরে ধীরে দেশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষা মন্ত্রী আ. ন. ম. এহসানুল হক ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-আহ্বায়করা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী জানান, বাপেক্সের অতীতের সফলতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে দীর্ঘ সময়গুলোতে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। দায়িত্ব নেয়ার পর জ্বালানি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে আরও পাঁচটি রিগ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর প্রতিবেশী দেশগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকায় গ্যাস উত্তোলন ও রপ্তানি শুরু করলেও বাংলাদেশে এ খাতে তেমন অগ্রগতি হয়নি। সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানের জন্য সম্প্রতি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ব্লক বরাদ্দ দেওয়া হবে।
গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের অভিজ্ঞতা সীমিত থাকায় এসব কাজ বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে করতে হবে বলেও মন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত দেশে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে কিছু সরবরাহচুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে। সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার মূল্যের তেল কিনেছে বলে মন্ত্রী জানান এবং এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্বে যেসব অঞ্চলে যুদ্ধ-উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, সেগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু অতীতে উচ্চ মূল্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে ভোক্তা জিম্মা রাখার ফলে বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে প্রথমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৫৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং চলমান বিল পরিশোধের দায়ও রয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
এই চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছেঃ ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বাস্তবে এর চেয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এছাড়া পরিবেশগত মানদণ্ড প্রয়োগের কারণে রপ্তানিতে ঝুঁকি এড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়ন জরুরি। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো তৈরি পোশাক খাতের জন্য পরিবেশগত মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে; অন্তত ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে না হলে রপ্তানিতে শুল্ক বাড়ার বা অন্যান্য বিধিনিষেধের ঝুঁকি আছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে ধারাবাহিকতা বাড়াতে ব্যাটারি-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য উপলক্ষে প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারিসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও কর ছাড় দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগের সুফল দেখাতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা মাত্র কয়েক মাস দায়িত্বে আছি; আশা রাখি আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল জনগণ দেখতে পাবে।













