বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ঈদ মানেই প্রেক্ষাগৃহে উপচে পড়া ভিড় ও ব্যবসার রমরমা—কিন্তু এবারের কোরবানির ঈদ সেই চিত্রই দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। মুক্তির দুই সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই হলগুলোর দর্শকসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বড় আশা আর প্রচারণার মধ্যেই মুক্তি পাওয়া একাধিক সিনেমা বক্সঅফিসে কাঙ্ক্ষিত সাড়া তুলতে পারেনি, ফলত প্রেক্ষাগৃহগুলো থেকে দ্রুতই ঈদের আমেজ মুছে যেতে শুরু করেছে এবং হল মালিক ও বিনিয়োগকারীরা চিন্তিত।
এই ঈদে মোট আটটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল, যার মধ্যে শাকিব খানের ‘রকস্টার’, মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’, আরিফিন শুভর ‘মালিক’ ও সৈকত নাসিরের ‘মাসুদ রানা’ উল্লেখযোগ্য। সাধারণত স্টার সিনেপ্লেক্স ও যমুনা ব্লকবাস্টারের মতো মাল্টিপ্লেক্সগুলো ঈদের সময় বিদেশি সিনেমা কম বাড়িয়ে দেশি চলচ্চিত্রকে অগ্রাধিকার দেয়; কিন্তু এবার দর্শক কমে যাওয়ায় তারা পুনরায় ‘মাইকেল’ ও ‘সিকিন নাইন’ের মতো বিদেশি সিনেমা দেখানো শুরু করেছে। প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের মতে, গত কয়েক বছরে চলে আসা সফলতার ধারায় এবার বড় ধাক্কা লেগেছে।
স্টার সিনেপ্লেক্সের বিপণন ব্যবস্থাপক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, কোনো সিনেমাই তাদের প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক লক্ষ্য ছাড়িয়ে যায়নি। হাতে গোনা দু-তিনটি ছবিই আছেন যা অনিয়মিতভাবে কিছু দর্শক টেনে আনছে, তবু তা হলের ধারণক্ষমতার তুলনায় নগণ্যই রয়ে গেছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বলও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, সিংগেল স্ক্রিনগুলোতেও দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়েছে অধিকাংশ ছবিই। বিশেষত শাকিব খানকে ঘিরে যে গণউন্মাদনা প্রতি বছর তৈরি হয়, এবার মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
অবস্থা আরও খারাপ করেছে পাইরেসি। শাকিব খানের ‘রকস্টার’ মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যে অনলাইনে ফাঁস হয়ে যায়। বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সিনেমার ভিডিও লিংক ছড়িয়ে পড়লে হলে যাওয়ার উৎসাহ কমে যায় এবং প্রত্যাশিত আয় ব্যাহত হয়। আগে শাকিবের ‘বরবাদ’ ও ‘তাণ্ডব’ও পাইরেসির শিকার হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর হাইপ থাকায় ভালো ব্যবসা করেছিল, কিন্তু ‘রকস্টার’-এর ক্ষেত্রে পাইরেসি বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে পরিবেশকরা মনে করেন।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ভরাডুবির মূল কারণগুলোর মধ্যে আছে দুর্বল চিত্রনাট্য ও দর্শকের রুচির সঙ্গে মিল না থাকা কাহিনি। যেখানে রোজার ঈদে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দীর্ঘ সময় প্রেক্ষাগৃহে রমরমা করেছিল, সেখানে কোরবানির ঈদের ছবিগুলো দ্রুতই সাদামাটা হয়ে ফিরছে—এটি ইন্ডাস্ট্রিকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শিল্পী ও প্রযোজকরা মনে করেন, দর্শকহীনতা কাটাতে ভবিষ্যতে আরও মানসম্মত, আধুনিক ও রুচিবোধের সাথে খাপ খাওয়ানো গল্পের ছবি বানানো ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি পাইরেসি প্রতিরোধে প্রযুক্তি ও আইনগত উদ্যোগ জোরদার করা এবং কনটেন্টের বৈচিত্র্য বাড়ানোও জরুরি বলেই তারা উল্লেখ করেন। এসব পদক্ষেপ নেওয়ায়ই প্রেক্ষাগৃহে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে, বলে চলচ্চিত্র জগতের অভিজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।














