ট্রেনমুল কংগ্রেসের অভ্যন্তরের অস্থিতিশীলতা যত বাড়ছে, ততই দেশের এবং রাজ্যের রাজনীতি পুনরুদ্ধারে মমতা ব্যানার্জি সর্বধরণের কৌশল মেলাতে তৎপর হচ্ছেন। দলের ভাঙন রোধ এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি ইন্ডিয়া জোটের আসন্ন বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লি যাচ্ছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সোমবার অনুষ্ঠিত হবে। মমতা ব্যানার্জি রবিবার দিল্লিতে পৌঁছে মঙ্গলবার পর্যন্ত থাকবেন। ইতিমধ্যেই অভিষেক ব্যানার্জি শনিবারই দিল্লিতে পৌঁছেছেন। ধারণা করা হচ্ছে মমতা, অভিষেক ও দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংসদ মিলিত হয়ে ওই বৈঠকে অংশ নেবেন।
দলের ভেতরের অস্থিরতার মাঝেই গত শুক্রবার মমতা বড় ধরনের সাংগঠনিক বদল করেছেন। এই রদবদলে মূলত তাঁর অনুগত ও অভিজ্ঞ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি অভিষেককে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রেখেছেন—যদিও সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর অভিষেকের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মমতা দুইজনকে যৌথ জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন—রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন ও ডোলা সেনকে। দলীয় সূত্র বলছে, এই সিদ্ধান্ত দিয়ে তিনি সংগঠনে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে একক থেকে যৌথভাবে পরিবর্তনের সংকেত দিয়েছেন। একটি উচ্চপদস্থ টিএমসি সাংসদের মতে, ‘‘দলের ভেতরের মূল অসন্তোষ এখন অভিষেককে কেন্দ্র করে ঘোরাচ্ছে; মমতা পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নেতৃস্থরের প্রতি আস্থা ফিরে পেতে মরিয়াভাবে কাজ করছেন।’’
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের আগে কংগ্রেসও টিএমসির পরিস্থিতি কড়া নজরে রাখছে। টিএমসি সূত্র জানিয়েছে, মমতা দিল্লি সফরের সময় সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করছেন, কিন্তু সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ নেতার কথায়, ‘‘সংকটের সময়ে কংগ্রেস আলাদা থাকবে না, তবে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাও দেখাবে না।’’
টিএমসির অভ্যন্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও মূল নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিধানসভায় প্রায় ৬০ জন বিদ্রোহী বিধায়কের সমর্থনে বিরোধী নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি প্রস্তাব দিয়েছেন যে মমতা দলে ‘প্রধান পরামর্শদাতা’ হিসেবে থাকতে পারেন—তবে এই প্রস্তাবকে ঘিরে বিদ্রোহী শিবিরেই মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্রোহী বিধায়ক গুলশান মল্লিক জানান, ‘‘যদি মমতা সর্বোচ্চ নেতা না থাকেন, তাহলে পুরো বিষয়টা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’’ অন্যদিকে বিধায়ক সুখীতা (সঙ্গীতা) রায় বসুনিয়া স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘‘মমতা আমাদের সর্বোচ্চ নেতা এবং তিনি থাকবেনই।’’
দলের ভেতরে ধর্মভিত্তিক সমীকরণও গুরুত্ব পাচ্ছে। মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৩১ জন মুসলিম বিধায়ক রয়েছেন; তাই এ গোষ্ঠীর অবস্থান রাজনৈতিকভাবে গুরত্বপূর্ণ। কিছু মুসলিম বিধায়ক ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরে যুক্ত হয়েছেন, কিন্তু অনেকে এখনও মূল নেতৃত্বের পাশে আছেন।
লোকসভায় টিএমসির ২৮ জন সাংসদের মধ্যেও বিদ্রোহের গুঞ্জন বাড়ছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে, মমতার দিল্লি অবস্থানকালে কিছু সাংসদ স্পিকারের কাছে অভিষেককে দলীয় সংসদীয় নেতা থেকে সরানোর দাবি তুলতে পারেন। দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা দাবি করেছেন, যদি ১৯ জনের বেশি সমর্থন আসে তবে অভিষেককে সরানো সম্ভব, এবং সেই সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে।
মোটকথা, এখন মমতার প্রধান লক্ষ্য দল ভাঙন থেকে রক্ষা করা এবং অভ্যন্তরীণ আস্থা পুনর্গঠন করা—তারই অংশ হিসেবে তিনি সংগঠনীক বদল, রাজনৈতিক কূটকৌশল ও কেন্দ্রীয় জোটের সমর্থন মিলিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছেন।













