লেবানন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে—এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্র। ইসরায়েলি বিমান ও গোয়েন্দা হামলা প্রতিদিনই চালানো হচ্ছে; হামলায় বড় ধরণের প্রাণবল-হানি এবং বস্তুনাশ ঘটেছে। সরকারি ও সামরিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সংঘর্ষ শুরুর পর ইসরায়েল লেবাননের উপর এক হাজার একশোর বেশি লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করেছে, আর দুর্বল হলেও চলমান ‘যুদ্ধবিরতি’র পরও তৎপরতা থেমে যায়নি। হিজবুল্লাহর অন্তত ৩৫০ জন সদস্য নিহত হওয়ার খবর এসেছে; সামগ্রিকভাবে গত ২ মার্চ থেকে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮৫২ জনে, আর এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বাসস্থান হারিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির কথিত ঘোষণাও মেলেনি বাস্তবে। ১৬ এপ্রিল থেকে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা থাকলেও কর্মক্ষেত্রে তার প্রভাব শোচনীয়ভাবে সীমিত। দক্ষিণ লেবাননে দখল করে রাখা ইসরায়েলি সৈন্যদের ওপর হামলা থেমে নেই; হিজবুল্লাহ পাল্টা জবাব দিচ্ছে এবং উভয়ের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা অরক্ষিত পর্যায়ে আছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনার প্রেক্ষিতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ছে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান বলেছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান কোনো চুক্তি করতে চায়, তাতে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি—নাহলে এই উত্তেজনা আরও বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা আবারও শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে, কিন্তু অগ্রগতির গতি এখনও ধীর। অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, লেবাননকে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে—যা গৃহযুদ্ধ পরবর্তী ক্ষণস্থায়ী শান্তিকে ভঙ্গ করতে পারে বলে আশংকা আছে।
ছায়া ড্রোন যুদ্ধ: যুদ্ধের নতুন অধ্যায়
দক্ষিন লেবানন ও ইসরায়েলের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে হিজবুল্লাহর ব্যবহার করা ‘এফপিভি’ বা ফার্স্ট পারসন ভিউ কামিকাজে ড্রোনগুলো। হিজবুল্লাহর গণমাধ্যম প্রধান ইউসেফ আল-জেইন বলছেন, যদি এফপিভি হামলায় ইসরায়েলি বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কূটনৈতিক আলোচনার চেয়েও কার্যকরভাবে ইসরায়েলকে পিছু হটাতে বাধ্য করবে।
গোষ্ঠীর এক কমান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের একটি বিশেষ ইউনিট ড্রোনের জন্য বাজার থেকে অংশপত্র সংগ্রহ করে এবং প্রতিটি যন্ত্রাংশকে কড়া নিরাপত্তা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবহার যোগ্য করা হয়। ২০২৪ সালের কিছু ঘটনাতেই তারা সতর্কতা বেড়েছে—এর ফলে ড্রোন অপারেশনে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
প্রথম এফপিভি হামলার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল ২২ মার্চে; আর ১১ এপ্রিলের ভিডিওতে প্রথমবার সরাসরি ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও ওয়ারহেড দেখা যায়। স্পেনভিত্তিক একজন ড্রোন বিশেষজ্ঞ বলেন, ওই ভিডিওতে প্রদর্শিত সিস্টেমগুলোর অনেক অংশ চীনা উৎপাদনের এবং অনলাইন বাজারে সহজেই মেলে—যা এই ড্রোনগুলোকে সস্তা ও গতিশীল করে তোলে।
হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত কিছু এফপিভি ড্রোন ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বলে দাবি করা হচ্ছে, ফলে উচ্চপ্রযুক্তির জ্যামিং সিস্টেমও কৌশলে এড়ানো যায়। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর একাংশকে টার্গেট করে এই ড্রোনগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংগঠনটি এখন পর্যন্ত ৪৫টিরও বেশি এফপিভি হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে; তন্মধ্যে ২৮টি হামলা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হওয়ার পরের চার সপ্তাহে ঘটে।
ইসরায়েলও পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে—এপ্রিলেই তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কমপক্ষে দু’টি প্রাণঘাতী এফপিভি হামলার প্রমাণ এবং সেই ড্রোনের ভিডিও প্রকাশ করেছে। উভয় পক্ষের এই ড্রোন ব্যবহার মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষত যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে তর্কে লিপ্ত।
সীমান্তে বিরামহীন সংঘাত ও সাম্প্রতিক হতাহত
গতকালের একটি ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় লেবাননের প্রধান দক্ষিণ–উত্তর মহাসড়কে চলন্ত তিনটি গাড়ি লক্ষ্য করে সর্বনিম্ন আটজন নিহত হয়েছেন; নিহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছেন—মহানগরীর দক্ষিণে জিয়েহ এলাকায় ঘটনার তীব্র ক্ষতচিত্র দেখা যায়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। আল জাজিরার দক্ষিণ লেবানের প্রতিবেদক সংঘাতের তীব্রতা সম্পর্কে বলেন, ‘‘সংঘাত কেবল বাড়ছে, বেসামরিকদের ওপর চাপ বাড়ছে এবং তারা অতি নাজুক মূল্য মুকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছে।’’
একই সময়ে ইসরায়েল লেবাননের সীমান্তের কাছাকাছি প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে একটি তথাকথিত ‘বাফার জোন’ দখল করে রেখেছে। বাফার জোনে থাকা ইসরায়েলি সৈন্যরা সরু এলাকায় স্থিতির কারণে ড্রোন আক্রমণের জন্য ঝুঁকিতে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির আগে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ড্রোনগুলো ইসরায়েলি স্থির অবস্থান, ট্যাংক ও খননযন্ত্রের মতো যানবাহন আঘাত করছি; যুদ্ধবিরতির পরে হিজবুল্লাহ সরাসরি সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে—সংগঠনটি পাঁচটি এমন হামলার কথা জানিয়েছে, আর ইসরায়েল স্বীকার করেছে যে এসব হামলায় তাদের তিনজন সৈনিক ও একজন ঠিকাদার নিহত হয়েছে।
কূটনৈতিক চ্যানেলে অস্থিরতা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আজ লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ওয়াশিংটনে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ মার্কিন মঞ্চে এই আলোচনার তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল কিছু দক্ষিণ লেবাননের গ্রাম—মেইস এল-জাবাল, ইয়ানোহ, বুর্জ শেমালি, হুলা, দেবল ও আব্বাসিয়াহ—সহকারে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং বলেছে, শিগগিরই ওই এলাকায় তীব্র অভিযান চালানো হবে; বেঁচে থাকতে স্থানীয়দের নিরাপদ, খোলা স্থানে অন্তত এক হাজার মিটার দূরে সরে যেতে বলা হয়েছে।
সংঘাত ঠেকানো এবং ব্যাপক রূপ নেবার সম্ভাবনা রুখতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চলছে; তবুও মাঠে জঙ্গলি অস্ত্রপ্রযুক্তি, ফার্স্ট পারসন ড্রোন ও সীমান্তে সরাসরি সংঘাতে মিশে যাওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণবিচ্ছিন্ন হয়ে উঠছে। লেবাননে বিধ্বংসী এই সংঘাত থেকে বাঁচতে হলে সীমান্তে সহিংসতা বন্ধ এবং রাজনৈতিক সমাধানের ত্বরান্বিত প্রয়াস সব পক্ষেরই অবিলম্বে নেওয়া জরুরি।














