টিকা সরবরাহ বাড়লেও এবং দেশের সর্বত্র জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু থাকলেও হামজনিত শিশুমৃত্যু থেমে নেই। গত ৫৩ দিনে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৩৩৬ শিশু মারা গেছে।
মার্চের মাঝামাঝি থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় সরকার ৫ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য এমআর-১ বুস্টার ডিজ টিকা দেওয়া শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, এ কর্মসূচিতে ইতিমধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ শিশু টিকা পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৯ শতাংশ। তবু টিকা কার্যক্রম শুরুর এক মাসের মাথায় একদিনে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল টিকাদানের ওপর নির্ভর করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। তাদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ সতর্কতা বাস্তবে মহামারির ইঙ্গিত দেয়, তাই আরও সক্রিয় এবং সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী রোগ নজরদারি ও আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে কঠোর আইসোলেশন ব্যবস্থা নেওয়া থেকে সরকারি পর্যায়ে অনেকে ফাঁক ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (৬ মে) সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে—এর মধ্যে ১ জনের ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত হয়েছে, বাকি ১১ জনে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা গেছে মোট ৪৫,৪৯৮ জন শিশুর; তাদের মধ্যে ৩১,৯১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ২৮,২৩৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
নির্দিষ্টভাবে, হাম শনাক্ত হয়ে যে শিশুটি মারা গেছে সে ঢাকায় মারা গেছে। হামের উপসর্গে মারা যাওয়ার মধ্যে বরিশালে ১, ঢাকায় ৫, খুলনায় ১, ময়মনসিংহে ১, রাজশাহীতে ২ ও সিলেটে ১ শিশু রয়েছে। এর আগেই ৪ মে একদিনে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু দেখায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৩৩৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হাম বিশ্বের অনেক জেলায় বাড়ছে, কিন্তু আমাদের মতো এত বেশি শিশুমৃত্যু অন্য কোথাও দেখা যায়নি—এ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার মূল কারণ হলো সমন্বিত এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের অভাব।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী জানিয়েছেন, বর্তমানে চলমান টিকাদানে ৬–৯ মাস বয়সী শিশুরা টিকার মাধ্যমে আনুমানিক ৫০ শতাংশ সুরক্ষা পায়, আর ৯–১২ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা প্রায় ৮৫ শতাংশ। তবে টিকার কার্যকারিতা সম্পূর্ণ কার্যকর হতে সাধারণত ২–৩ সপ্তাহ সময় লাগে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ক্যাম্পেইনের মতো যদি টিকাদানে ৫ বছরের বদলে ১৫ বছর পর্যন্ত লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হতো, তাহলে আক্রান্তের হার অনেকটা কমত, কারণ বড়রাও সংক্রামক носক হতে পারে। তাছাড়া জ্বর বা পাতলা পায়খানা দেখলেই শিশুকে দ্রুত আইসোলেশনে রেখে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও তদারকি করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
বিশেষজ্ঞরা আবারো ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে টিকাদানের পাশাপাশি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, দৃঢ় রোগ নজরদারি, ব্যাপক জনসচেতনতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত আইসোলেশন ব্যবস্থা জরুরি—এগুলো ছাড়া শুধু টিকাদান দিয়েই এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।













