গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও ভারতের পাহাড়ি ঢলের জেরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল জলোদিস্মত হয়ে পরেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার শমশেরনগর, পতনঊষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির বোরো ধান এবং প্রায় ৫০ হেক্টর সবজি ক্ষেত শেষ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও উজান থেকে ঢলের পানি আবার বাড়ছে; আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ভারী বর্ষণের সতর্কতা দিয়েছে, ফলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। ফজলু মিয়া, আনোয়ার খাঁন, আকতার মিয়া ও ফটিকুল ইসলাম জানান, কেওলার হাওরসহ নিন্মাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এলাকা দীর্ঘদিন ধরে পানিতে ডুবে থাকায় বোরো ফসল সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকেই বীজ, সার ও শ্রম খরচ করে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন; এখন ধান বিক্রি না হলে পরিচালনায় ধরা পড়া কৃষকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কিছু কৃষক অভিযোগ করেছেন যে স্থানীয় কৃষি অফিস প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ঠিকভাবে প্রকাশ করছে না।
উপজেলার মাঠপর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পানি কিছুটা নামলেও ফের বৃষ্টি শুরু হলে নিম্নাঞ্চলে পুনরায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। চার দিন ধরে পানিতে থিয় থাকতে থাকতে অনেক সবজি ক্ষেত কচটে জলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহও প্রভাবিত হচ্ছে।
কৃষকরা আরও বলছেন, ব্যক্তিগত গণনা অনুযায়ী শমশেরনগর, পতনঊষার, আলীনগর, মুন্সিবাজার ও রহিমপুরসহ কয়েকটি ইউনিয়নের মিলিয়ে প্রায় এক হাজার হেক্টর সম্পূর্ণভাবে এবং আরও এক হাজার হেক্টর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এছাড়া শতাধিক হেক্টর সবজি ক্ষেত নষ্টের কথা জানিয়েছেন তারা। তারা জরুরি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ চান।
তবে উপজেলা কৃষি অফিসের প্রকাশিত তথ্যভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী এ মৌসুমে কমলগঞ্জে মোট ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে এ পর্যন্ত ২৮০ হেক্টর সম্পূর্ণ এবং ৩০৫ হেক্টর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ৯৫০ হেক্টরের সবজি জমির মধ্যে ৩৫ হেক্টর সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে; বাকি কিছু জমিতে আংশিক ক্ষতি আছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় গণমাধ্যমকে জানান, বৃষ্টিপাত ও পানিতে ডুবে থাকা সংক্রান্ত ক্ষতির তথ্য সংরক্ষণ করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং জরুরি সমন্বয় চলছে। তিনি কৃষকদের যৌথভাবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব জমা দিতে অনুরোধ করেছেন যাতে উপযুক্ত সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের শ্রীমঙ্গল শাখা বলছে, সিলেট বিভাগসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এপ্রিল মাসে এ অঞ্চলে মোট ৪৮৩ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে এবং গত ২৫ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩১৫ মিমি বৃষ্টি নথিভুক্ত হয়েছে—এই গতিপ্রকৃতির ধারাবাহিকতাই নিচু জায়গাগুলোতে জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে।
কৃষকরা দ্রুত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, কাঁচামালের ক্ষতিপূরণ ও পরবর্তী বীজবপন ও পুনরুদ্ধারের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ চাচ্ছেন, নতুবা সংকট আরও গম্ভীর রূপ নিতে পারে।














