বাঙলার বাউলসংগীত ও লোকজ দর্শনের এক পরিচ্ছন্ন দীপক নীরব হয়ে গেলেন—প্রখ্যাত বাউল শিল্পী কানাই দাস বাউল আর নেই। গত ১৮ এপ্রিল তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। বিদায়টাকে আরও নীরব করে দিয়েছে সেই শেষ উপহারটি: নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের আসন্ন চলচ্চিত্র ‘রইদ’-এর জন্য দেওয়া তার প্রথম এবং শেষ প্লেব্যাক গান।
দৃষ্টিহীনতার গণ্ডি পেরিয়ে জীবনভর একতারা হাতে গ্রাম-গঞ্জে ঘোরেন তিনি। মেলা, আখড়া কিংবা উৎসবে তাঁর কণ্ঠের আধ্যাত্মিক গভীরতা শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। ‘‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’’ কিংবা ‘‘কে বলে মানুষ মরে, আমি বুঝলাম না ব্যাপার’’—এসব কালজয়ী গানের মাধ্যমেই তিনি মানবতার গান গিয়ে গেছেন। দৃষ্টিহীনতা থাকলেও তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও সুরে মানুষের মনের ছায়া-আলোক জানানো হতো।
চলচ্চিত্রে কানাই দাসের গান থাকার বিষয়টি নিয়ে আবেগে ভাসেছেন ‘হাওয়া’-খ্যাত পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন। গত বছর ‘রইদ’ প্রযোজনার সময় তিনি কানাই দাসকে একটি বিশেষ গান রেকর্ড করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। যখন পরিচালক জানতে চেয়েছিলেন—আগে কোনও সিনেমায় গেয়েছেন কি না—শিল্পী বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘কেউ তো ডাকেনি!’’ সিনেমার জন্য তিনি মাতান চাঁদ গোঁসাইয়ের একটি বিখ্যাত গান রেকর্ড করেছিলেন। নির্মাতার কথায়, গানটির চূড়ান্ত মিশ্রণের আগেই তিনি তা শুনতে আগ্রহী ছিলেন; কিন্তু প্রকাশের আগেই তাঁর চলে যাওয়ায় তা সবাইকে গভীর শূন্যতা দিয়েছে।
মেজবাউর রহমান সুমনের কাজের সঙ্গে বাউল দর্শনের লাগাতার সংযোগ আছে। তাঁর পূর্ববর্তী সুপারহিট সিনেমা ‘হাওয়া’-তে বাসুদেব দাস বাউলের কণ্ঠ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এবার ‘রইদ’-এর মাধ্যমে তিনি কানাই দাস বাউলের সেই অকৃত্রিম, মেঠো সুরকে আরও বড় পর্দায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। যদিও শিল্পী নিজেই চূড়ান্ত রেকর্ড শোনার সৌভাগ্য পাননি, পরিচালক নিশ্চিত করেছেন—তার কণ্ঠ খুব শীঘ্রই দর্শক-শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাবে।
এখন ‘রইদ’ মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সিনেমায় মুখ্য চরিত্রে আছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি এবং গাজী রাকায়েতসহ অন্যান্য দক্ষ অভিনয়শিল্পীরা। সিনেমার প্রথম গান ‘রইদে আইলা গা জুড়াইতে’ ইতোমধ্যেই মুক্তি পেয়ে শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। সহজিয়া ব্যান্ডের রাজীব আহমেদ রাজু গানটির কথা ও সুর করেছেন, আর সংগীতনির্দেশনা দিয়েছেন রাশীদ শরীফ শোয়েব।
কানাই দাস বাউলের প্রয়াণের পর দর্শক ও সংগীতপ্রেমীদের নজর এখন তার সেই শেষ গানের দিকে—যা বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে এক অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে manyরা মনে করছেন। সব মিলিয়ে ‘রইদ’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি হবে এক অমোঘ স্মরণ—কানাই দাস বাউলের জীবনীমূলক সুরিফলক এবং মেজবাউরের নির্মাণশৈলীর সংমিশ্রণ।














