যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের মধ্যেই পারস্য উপসাগরের ইরানি বন্দরে গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি ট্যাংকার এসে নোঙর করেছে এবং লাখ লাখ ব্যারেল কাঁচা তেল ভরার কাজ শুরু হয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের স্যাটেলাইট চিত্র, জাহাজ চলাচলের তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই এই তথ্য উঠে এসেছে।
ওই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালির পাশের বন্দরগুলোতে পাঁচটি খালি ট্যাংকার জাহাজ ভিড়েছে এবং সেগুলোতে মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যারেল তেল ভরার কাজ শুরু হয়েছে। তেল ভর্তি করা এই নৌযানগুলো এখন কোথায় আছে—সেটাও অনিশ্চিত; ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে মোট প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল ওই জাহাজগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
হরমুজের অন্য প্রান্তে, ওমান উপসাগরে ঘুরছিল আরও পাঁচটি ট্যাংকার। স্যাটেলাইট চিত্রে সাপ্তাহিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ওই জাহাজগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, গত ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া অবরোধের পরে কোনো জাহাজই সেই বেড়াজাল ভাঙতে পারেনি—তবে বাস্তবে বন্দরে ঢুকছে বা তেল সরবরাহ চলছে, সে চিত্র মিশ্র।
ওয়াশিংটন পোস্টের রিভিউয়ে মোট ১০টি জাহাজকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর গতিবিধি ও অবস্থান অবরোধের আওতাভুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে, যদিও নৌ-অবরোধ চলছে, তবুও ইরানের তারুণ্যভিত্তিক তেল সরবরাহ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি—ট্যাংকারগুলোকে ভাসমান স্টোরেজ বা সরবরাহ চেইন বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইরান ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় বলে জানানো হয়েছিল। শুক্রবার তেহরান ঘোষণা করেছে যে নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেছেন, ‘‘প্রণালি খুললেও ইরানের সঙ্গে লেনদেন শতভাগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বজায় থাকবে।’’
ইউএস সেন্ট্রাল কম্যান্ড জানিয়েছে, এই অবরোধে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা, দেবশত নৌযান এবং একগুচ্ছ যুদ্ধবিমান ও ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। ব্রিফিংয়ে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন একটি মানচিত্র দেখিয়ে জানান যে অবরোধ রেখাটি ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ওমানের রাস আল হাদ্দ উপদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত।
তবে একটি নিরাপত্তা সূত্র স্বীকার করেছে যে, ইরানের বন্দরের আশপাশে এখনও অনেক ট্যাংকার সক্রিয় রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, অবরোধ-সীমানার মধ্যে সন্দেহভাজন বহু জাহাজ—সংখ্যায় দুই অঙ্কের—উপর নজর রাখছে মার্কিন বাহিনী এবং প্রয়োজন পড়লে এগুলোকে আটকানো হবে।
সামরিক কৌশলে ওমান উপসাগর অবরোধ রাখলে মার্কিন বাহিনী পারস্য উপসাগরের তুলনায় অগভীর ও সঙ্কীর্ণ জলপথ এড়িয়ে চলতে পারে এবং ডেস্ট্রয়ারগুলোর গতি ও দক্ষতা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ডেস্ট্রয়ারগুলো ঘণ্টায় ৩০–৩৫ মাইল বেগে চলে; তুলনায় সাধারণ তেলের ট্যাংকারের গতি প্রায় ঘণ্টায় ১৫ মাইলের কাছাকাছি।
স্যাটেলাইট চিত্রে তেল পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ট্যাংকার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ‘হিল্ডা ১’, ‘সিলভিয়া ১’ ও ‘আম্বার’ নামের তিনটি ট্যাংকার খারগ দ্বীপে নোঙর করেছে—খারগ দ্বীপ থেকেই ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই হয়। এই তিন জাহাজে মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আছে বলে তারা ধারণা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খারগের মতো টার্মিনালে তেল জমে গেলে বড় ধরনের ক্ষতি বা উৎপাদন অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যাহত হতে পারে; সেকারণেই ভাসমান ট্যাংকারগুলোর মাধ্যমে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা হচ্ছে যাতে স্টোরেজে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক পেট্রাস কাটিনাস বলছেন, এসব জাহাজ আদতে ভাসমান স্টোরেজের কাজ করছে—তাতে তেলের জোগান এক জায়গায় আটকে থাকে না।
ট্যাংকার ট্র্যাকার্স আরও জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরের ইরানের সর্বোত্তর বন্দর মাহশাহরেও ‘আর্নিকা’ নামের এক ট্যাংকারে তেল ভরা হয়েছে। এছাড়া মাহশাহরের দক্ষিণ-পূবে আসালুয়েহ বন্দরে একটি পানামার পতাকাবাহী ‘ইয়ং তাই’ নামে চীনা মালিকানাধীন জাহাজে ক্রুড পণ্য বোঝাই করা হয়েছে বলে তারা চিহ্নিত করেছে।
কেপলার নামের সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা বলছে, কিছু ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে ঢুকলেও এখনো কোনও বন্দরে নোঙর করেনি—তবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে জাহাজগুলোর অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য বিকৃত করে ভুয়া কোঅর্ডিনেট সম্প্রচার করাও সম্ভব, যাতে তাদের আসল অবস্থান গোপন রাখা যায়।
সংক্ষেপে, মার্কিন নৌ-অবরোধ থাকলেও স্যাটেলাইট চিত্র, রেকর্ড ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ইরানের বন্দরে তেল উঠানামা এবং ভাসমান স্টোরেজের মাধ্যমে রপ্তানি কার্যক্রম কিছুটা হলেও জারি আছে। ফলে অভ্যন্তরীণ স্টোরেজের চাপ কমানো এবং রপ্তানি অব্যাহত রাখার চেষ্টা হচ্ছে—এবং এটি নৌ-অবরোধ কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।














