আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিটের আকাশছোঁয়া দামে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষত ‘‘ডায়নামিক প্রাইসিং’’ বা গতিশীল মূল্য নির্ধারণের কারণে সাধারণ ভক্তদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া টিকিটগুলোর বিরুদ্ধে অনেকে ‘বিলাসিতা’ ও ‘অবান্তর’ অভিযোগ করছেন। প্রতিটি ম্যাচের সিটের মূল্যই চাহিদা অনুযায়ী উঠানামা করায় সাধারণ দর্শকরা বেসিক খরচ বহন করতে পারবেন না—এমনটাই তাদের শিকায় আসছে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই সমালোচনাকে তেমন পাত্তা দিচ্ছেন না। তিনি ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে’কিপকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে ৩৯ দিনের এই টুর্নামেন্ট, এবং এর মাধ্যমে অর্জিত আয়ই ফিফার পরবর্তী বিশ্বকাপ হওয়া পর্যন্ত ৪৭ মাস ধরে তাদের বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম চালাবে। তার দৃষ্টিতে এককালীন এই রাজস্ব সংগ্রহ ছাড়া ফিফার কর্মসূচি, ফুটবল উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ব্যয় চালানো সম্ভব নয়।
ইনফান্তিনোর উদাহরণ অনুসারে, গ্যালারির সামনের সারিতে খেলাঘরে বসে খেলার টিকিটের দাম হতে পারে প্রায় ৪ হাজার ১০৫ মার্কিন ডলার — যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকারও বেশি। এর উপরে ভ্রমণ, থাকার খরচ, স্টেডিয়ামের পার্কিং ফি ও বড় শহরে বাড়ানো গণপরিবহন ভাড়া যোগ করলে একটি খেলার জন্য একজন সাধারণ ভক্তকে বহুগুণ খরচ বহন করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক জায়গায় দেখা গেছে স্টেডিয়ামের পার্কিং ফি টিকিটের মূল্যের কাছাকাছি বা তার থেকেও বেশি।
ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনফান্তিনোর ভাষায় এখানে অনুশোচনার স্বকীয় প্রকাশ নেই—এটি এক ধরনের গাণিতিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত। বিশ্বকাপই ফিফার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস; তাই আয় বাড়াতে এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিশ্চিত করতে উচ্চমূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। তবে সমর্থকরা মনে করেন, এই যুক্তি ভক্তদের আবেগ ও অংশগ্রহণকে পাতায় না দিয়ে শুধুই বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
আরও এক জটিলতা হলো টুর্নামেন্টটিকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুগুলোও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে—কিছু দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য তাত্ত্বিক বাধার কারণে এবারের আয়োজন অনিশ্চিত বা অস্বস্তিকর পরিবেশে শুরু হতে পারে, বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, উত্তর আমেরিকার তিন দেশে আয়োজিত এই ২৩তম বিশ্বকাপটি ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল আসর হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফিফার এই আর্থিক মডেল যতক্ষণ অপরিবর্তিত থাকবে, ততক্ষণ সাধারণ ভক্তদের পকেট থেকে বড় অংকের অর্থ খসে যাবে—এটা বেশিরভাগ বিশ্লেষকই নিশ্চিত মনে করছেন।
ফুটবল মাঠে উত্তেজনা যেমন বহুল প্রত্যাশিত, তেমনই মাঠবহির্ভূত অর্থনৈতিক বিতর্কও বিশ্বকাপের আবহকে ছায়াযুক্ত করে ফেলেছে। ইনফান্তিনোর ‘এক মাসের আয় দিয়ে ৪৭ মাস চালানোর’ যুক্তি আধুনিক ক্রীড়া বাণিজ্যের এক কঠোর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেল, ওই বাস্তবতাকে মানিয়ে নেওয়া কি ভক্তদের খরচ বহন করার মতো ন্যায্য ও টেকসই?














