ঢাকা | বুধবার | ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৭শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

পর্দার আড়ালে সিরিয়াল কিলারের ছায়া: ‘দ্য টিকটক কিলার’–এ উন্মোচিত রোমহর্ষক সত্য

একাকী ভ্রমণ অনেকের কাছে স্বাধীনতা ও রোমাঞ্চের প্রতীক। কিন্তু নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক তথ্যচিত্র সিরিজ ‘দ্য টিকটক কিলার’ দেখায় যে এই রোমাঞ্চের আড়ালে কতটা ভয়াবহ বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে। স্পেনের এক নারীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ঘিরে নির্মিত এই সিরিজটি কেবল একটি অপরাধকাহিনি নয়—ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর অন্ধ বিশ্বাসের ভয়ানক পরিণতির এক কাঁচা প্রমাণও বটে।

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ৪২ বছর বয়সী ভ্রমণপ্রেমী এস্থার এসতেপা। ব্যক্তিগত ভ্রমণের শখেই তিনি একাকী স্পেনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতেন। এক অনুষ্ঠানে বা হোস্টেলের লবিতে পরিচয় হয় হোস হুরাদো মন্টিলার সঙ্গে। মন্টিলা ছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় একজন ট্রাভেল ব্লগার—তার প্রাণবন্ত ভিডিও, রোমাঞ্চকর ভ্রমণকাহিনি ও মধুর আচরণে এস্থার দ্রুত মুগ্ধ হন। মণটিলার সঙ্গে একসাথে নতুন পথচলা এস্থার জন্যও আকর্ষণীয় মনে হয়, আর সেই যাত্রাই পরবর্তীতে তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালের আগস্টে দু’জনে এক দীর্ঘ পদযাত্রার পরিকল্পনা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় এস্থারকে স্থানীয় এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল থেকে বেরোনোর পর থেকেই তাঁর আচরণ বদলে যেতে শুরু করে, আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও অস্বাভাবিকভাবে লোপাট হতে থাকে। এস্থারের মোবাইল ফোন থেকে পরিবারের কাছে আসে কিছু অদ্ভুত বার্তা—জানানো হয় তিনি আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন এবং নতুন জীবন গঠনের উদ্দেশ্যে আর্জেন্টিনায় যাচ্ছেন। কিন্তু এস্থারের মা হোসেপা পেরেজ বার্তাগুলোর ভাষা ও রীতির পরিচিত স্বরলিপি দেখে দ্রুত বুঝতে পারেন এগুলো তার মেয়ের লেখা নয়। এরপর থেকেই এস্থারের আর কোনো সন্ধান মেলে না।

প্রাথমিকভাবে স্থানীয় পুলিশ নিখোঁজ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণভাবে নেয়নি; তারা ধারণা করেছিল এস্তার হয়তো স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়ে গেছেন। পরিবারের ধৈর্য এভাবেই শেষ হয়ে না—তারা নিজেই অনুসন্ধান চালানো শুরু করেন এবং খুঁজে পান মন্টিলাকে, যিনি এস্থারের শেষ দেখা লোক ছিলেন। মন্টিলা দাবি করেন তিনি এস্থারকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে আর কিছু জানেন না। কিন্তু পরিবারের অনুচরিত অনুসন্ধান ও ইন্টারনেটে মন্টিলার সম্পর্কে তথ্য তল্লাশি শুরু করলে ধীরে ধীরে এক ভয়ানক সত্য আবিষ্কার হয়: যাকে অনেকে দয়ালু ট্রাভেল ব্লগার হিসেবে চিনতেন, তিনি আসলে পুরনোতম দণ্ডপ্রাপ্ত এক সিরিয়াল কিলার; মন্টিলা অতীতে চারটি পৃথক হত্যাকাণ্ডের জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন।

তদন্তে বড় মোড় আসে মন্টিলার নিজের টিকটক ভিডিও ও অনলাইন পোস্টগুলোর ডিজিটাল ট্রেইল থেকে। অপরাধের পরও তিনি নিয়মিত ভিডিও আপলোড করতেন—কিছু ভিডিওতে লোকেশন ও জিও-ট্যাগ ছিল, আবার দৈনন্দিন আচরণও প্রকাশ্য ছিল। তদন্তকারীরা এই তথ্য ব্যবহার করে তল্লাশি চালিয়ে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি মানুষের খুলি ও পরে জুনে বাকি শরীরের অংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয় যে উদ্ধার করা এসব দেহাংশ নিখোঁজ এস্থার এসতেপারই। মন্টিলা এখন এই হত্যাকাণ্ডসহ কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত ও কারাবন্দি, যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তথ্যচিত্রটির নির্মাতা হেক্টর মুনিয়েত্তি এই কাহিনীকে সামনে রেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিচ্ছেন: সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের দেখানো ঝলমলে ছবি ও সুন্দর জীবন অনেকসময় বিভ্রান্তিকর এবং ছদ্মবেশে ঢাকা থাকতে পারে। একজন নির্মম খুনি সহজেই ক্যামেরার সামনে দয়ালু পর্যটকের ভূমিকায় অভিনয় করতে পারেন—আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই খলনায়কের ছদ্মবেশ আরও শক্ত করে তোলে।

‘দ্য টিকটক কিলার’ সিরিজটি শুধু একটি অপরাধের রহস্য উন্মোচন করে না; এটি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসু ও অনলাইন বন্ধুত্ব গড়ার আগে সবাইকে সতর্ক করে দেয়—ডিজিটাল পরিচিতি যতই প্রাণবন্ত হোক, জেনে-শুনে ও সতর্কতায়ই বিশ্বাস করা নিরাপদ।