কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (কুমেক) শিশু বিভাগ শয্যা ও জায়গা সংকটে মারাত্মক চাপের মুখে। হাম সংক্রমণ শুরুর পর পরই কুমিল্লা ও আশপাশের জেলার শিশু রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ ওয়ার্ড ও তিনটি আইসোলেশন ইউনিট চালু করেও পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাচ্ছে না; বহু শিশুকে বারান্দা বা মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
গত সোমবার (৬ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, নিচতলায় একটি ও দ্বিতীয় তলায় দুইটি কক্ষ মিলিয়ে তিনটি আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর থেকে আসা অন্তত ৩২ জন শিশু। শয্যা সংকটের কারণে অনেকেই বারান্দায় চাটাই বিছিয়ে থাকতে বাধ্য; কেউ কেউ মেঝেতেই শুতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব না হওয়ায় গাদাগাদি হয়ে ঝুঁকির মধ্যে চলছে চিকিৎসা।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ থেকে হাজির হওয়া হাম আক্রান্ত ছয় মাস বয়সি আয়াতের মা ফারজানা আক্তার বলেন, “শিশুর অবস্থা গুরুতর হয়ে এখানে এনেছি। ভেন্টিলেশনে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু জায়গার খুব কষ্ট।” ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে আসা পাঁচ মাস বয়সি রাজুর বাবা সুখেন দাশ বলেন, “ডাক্তার কুমিল্লায় পাঠিয়েছে; কিন্তু এখানে এসে কোনো সিট পাইনি। বারান্দাতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।”
কুমেক শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ জানান, “সাধারণ সময়েই ৪০ শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা তিনগুণ থাকে; হাম সংক্রমণের পরে চাপ আরও দ্বিগুণ বেড়েছে। বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের রোগীরা উন্নত চিকিৎসার আশায় এখানে ভিড় করছেন।” তিনি বলেন, পদুয়ার বাজার বেলতলীতে নির্মিত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল চালু হলে সংক্রমিত রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ও বিশেষায়িত সেবা দিয়ে কুমেকের ওপর চাপ অনেকটাই কমানো যেত।
মালিকানা ও পরিচালনার জটিলতার কারণে সেই আধুনিক তিনতলা হাসপাতাল ভবন দেড় বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণ সম্পন্ন থাকলেও খালি পড়ে আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে পদুয়ার বাজার বেলতলীর ওই ভবনটি ঘুরে দেখা যায়—পুরো অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও সেখানে নেই ডাক্তার, নার্স, যন্ত্রপাতি বা আসবাবপত্র।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, ২০২০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় কাজ সম্পন্ন হয়ে ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দায়িত্ব নির্ধারণে সময় লাগায় জনবল ও সরঞ্জাম বরাদ্দ করা হয়নি। কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, “প্রাথমিকভাবে কুমেককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা নিলে না। পরে আমাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনবল ও যন্ত্রপাতি বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে; দ্রুত ব্যবস্থা নিলে হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হবে।”
স্থানীয়রা প্রশ্ন করেন—যেখানে শিশু রোগীরা বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে, সেখানে আধুনিক একটি ১০০ শয্যার হাসপাতাল কেন দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকবে? দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে চলমান সংক্রমণের মধ্যে রোগীর ভোগান্তি আরো বাড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।














