ঢাকা | মঙ্গলবার | ৩১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১২ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

ইরান যুদ্ধের গতি পরিবর্তন করতে পারে মার্কিন পরিকল্পনা

ইরানের ছোট একটি দ্বীপ দখলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই দ্বীপে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল টার্মিনাল, যা দেশটির অর্থনীতির অন্যতম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ‘খারগ’ নামে এই দ্বীপটি ইরানের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, কারণ এটি এই দেশের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং খারগ দ্বীপকে কাবু করার পরিকল্পনা করছেন۔ তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর জন্য প্রয়োজন সময়ের কিছু সীমা পার হতে হবে। তিনি বলে থাকেন, ‘আমরা এই দ্বীপ দখল করতে পারি, তবে সেটা আমরা করব কি না, তা এখনো আলোচনা চলছে। তবে এটা স্পষ্ট, আমাদের কিছু সময় সেখানে থাকতে হবে।’ ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘আমাদের কাছে অনেক বিকল্প রয়েছে। আমি মনে করি, খুব সহজেই এটি দখল করতে পারব, কারণ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তেমন শক্তিশালী নয়। আমাদের জন্য এটি খুবই সম্ভব।’ এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, মার্কিন প্রশাসন ইরানের হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে এই দ্বীপের উপর নজরদারি চালাচ্ছে। এই প্রণালীটি এমনই গুরুত্বপূর্ণ, যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌচলাচল পথ। এই খবরে আরও দেখা যায়, মার্কিন সেনা ও সামরিক প্রস্তুতিতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিবিসির মার্কিন সহযোগী সংস্থা সিবিএস নিউজের সূত্র জানায়, পেন্টাগনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ইরানে আরও সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে SSS সেনা টিম ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’র নেতৃত্বে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মার্কিন সেনা পৌঁছে গেছে। উভয় পক্ষই তাঁদের পরিকল্পনা বা সেনা মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ করেনি, তবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পরিস্থিতি অনুযায়ী বিকল্প সবরকম করণীয় বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এটি ইরানের অর্থনীতির প্রাণশক্তির মূল রুট খারগ দ্বীপের উপর আঘাত হানবে এবং ইরানের সামরিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, দ্বীপটি দখলে নেওয়ার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উপর চাপ সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপ থেকেই রপ্তানি হয়। ট্রাম্পের ঐকান্তিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পাইপলাইনগুলোর ওপর আঘাত হানলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা পড়বে। তবে তিনি এই ধরনের পদক্ষেপের আগ্রহ দেখালেও অনুরোধ করলেন, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এড়ানোর জন্য, এই পরিকল্পনা এখনো অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, খারগ দ্বীপে মার্কিন সামরিক অভিযান হবে তুলনামূলক ছোট, তবে এটি চ্যালেঞ্জিম হবে। নৌযান কিংবা আকাশপথ ব্যবহার করে এ অভিযান চালানোর জন্য অনেক দূর থেকে সামরিক বাহিনী পৌঁছাতে হবে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সতর্ক করে বললেন, ‘ইরান মার্কিন সেনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। যদি তারা আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করে, তাহলে কঠোর প্রতিহত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সেই অবস্থা হবে মারাত্মক।’ খারগ দ্বীপটি শুধু ১৫ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত, এটি ইরানের উপকূল থেকে খুবই কাছাকাছি। এই ছোট দ্বীপটি মূলত ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে অবস্থিত টার্মিনালটি দেশের ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে, যা সরাসরি পাইপলাইন মাধ্যমে মূল দেশ থেকে যুক্ত। ট্রাম্প ও তার প্রশাসন এই পাইপলাইনগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করলেও, তিনি এখনো এ ব্যাপারে আরও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ঠেকানোর জন্য বিরত রয়েছেন। এই টার্মিনালের পাশে বিশাল আকারের ট্যাঙ্কারগুলো তেল বহনে সক্ষম, প্রতিটিতে ৮৫ মিলিয়ন গ্যালন পর্যন্ত তেল পরিবহন করার সামর্থ্য আছে। মূল ভূখণ্ডের অগভীর উপকূল জটিলতর, অন্যদিকে এই দ্বীপের গভীর উপকূল সহজে জাহাজ চলাচল বা তেল পরিবহনের জন্য সুবিধাজনক। বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন সেনারা বহু দূর থেকে নৌ ও আকাশপথে আসতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৩ মার্চ এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, মার্কিন সেনারা হরমুজ প্রণালীসহ খারগ দ্বীপের প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে, তিনি আরও যোগ করেন যে, তারা ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই এই কাজ করেছেন। সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যানুযায়ী, তারা শতাধিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে গেছে। তবে, ইরানের সরকার এই দাবিকে অস্বীকার করে জানিয়েছে যে, দ্বীপের তেল সংক্রান্ত কোনও ক্ষতি হয়নি। তারা বলছে, মার্কিন সেনারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌঘাঁটি এবং বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি দিকেরই নিজস্ব যুক্তি ও পরিকল্পনা রয়েছে।