বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য মঙ্গলবার দুই শতাংশের বেশি বাড়ে, যা হরমুজ প্রণালি নিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা সম্পর্কে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার ফল। আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতি অনুযায়ী, এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সকালেই ২.৮১% বাড়ে এবং ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলারে পৌঁছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডাব্লিউটিআই তেলের দাম ২.৪৩% বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ ডলার ৯৩ সেন্ট। (সূত্র: সিএনবিসি)
গত কয়েক দিনে তেলের বাজারে ওঠানামা তীব্র হয়েছে — কখনও দাম বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারের উপরে যায়, আবার দ্রুত ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং পুনরায় উর্ধ্বগতির স্বরূপ দেখায়। এই অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতাকে বলা হচ্ছে।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকির বিশ্লেষক সল কেভনিক জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অসম ও বিরোধাভাস বার্তা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মূলত সংঘাতের চলমান পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রাখছেন কারণ সংঘাত তীব্র হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূত্র Monday-এ বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুজাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে জোট গঠন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, ’কোনো কোনো দেশ খুবই উৎসাহী, আবার কোনো কোনো দেশ অতটা আগ্রহী নয়। আমি মনে করি, কেউ কেউ এতে অংশ নেবে না, অথচ তাদের আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিপুল ব্যয়ে সুরক্ষা দিয়ে আসছি।’
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা জোরদারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সহযোগিতা চেয়েছে। ইরানের হামলার পর এ পথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। আইএনজি’র পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেন, সরবরাহে যে ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে তা দ্রুত সমাধানযোগ্য নয়। বিমা সুরক্ষা বা নৌবাহিনীর পাহারা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হতে পারেনি কারণ এতে নৌবাহিনীকেই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে।
ওমান এবং ইরানের মাঝামাঝি অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট। ২০২৫ সালে এ পথে দৈনিক গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা সমুদ্রপথে পরিবহিত মোট তেলের প্রায় ৩১%। জ্বালানিবিষয়ক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের সতর্কতা অনুযায়ী, এ রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ সংকট দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে জরুরি মজুদ থেকে আরও তেল ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল জানান, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যে বড় পরিসরে মজুদ তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও মজুত তেল ছাড়ার অপশন এখনো রয়েছে।
সংক্ষেপে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো তেলের আন্তর্জাতিক মুল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং বাজারের অস্থিরতা কাটাতে দ্রুত কার্যকর সমাধানের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে।












