ঢাকা | বুধবার | ১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২২শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে এখনও নীতিগত সুযোগ: সিপিডি

জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে নীতिगत কিছু সুযোগ সরকারের হাতে এখনো আছে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, এই সুযোগগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামির প্রভাব המקומি বাজারে সীমিত রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা—যার মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘‘২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সিপিডির পরামর্শ’’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব মন্তব্য করেন সংস্থার নেতৃত্ব ও গবেষকরা। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

সিপিডি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে; এর প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে চলে গেছে। তবুও নীতি–উপকরণ প্রয়োগ করে স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থার বিশেষজ্ঞরা।

মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব নির্ভর করে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। বাংলাদেশে জ্বালানির ওপর প্রায় ২০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কর আরোপিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে এসব করের অংশ কমিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ লাঘব করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি স্মরণ করান, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জ্বালানি আমদানিতে আরোপিত ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, দেশে বর্তমানে ডিজেল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানির কয়েক সপ্তাহের মজুত আছে। কিন্তু স্থায়ী কৌশলগত জ্বালানি মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ না থাকায় বড় ধরনের বিঘ্নের সময় সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়—যা প্রতিবেশী অনেক দেশে রয়েছে। এ ধরনের রিজার্ভ থাকলে সঙ্কট মোকাবিলা সহজ হতো এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যেত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কে বেশি করে জ্বালানি কেনার প্রবণতা (প্যানিক বায়িং) দেখা যাচ্ছে, যা চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সমস্যাকে জটিল করে। তাই বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা ও সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি, বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

সরকার ইতোমধ্যে স্পট মার্কেট থেকে তেল কেনা শুরু করেছে এবং ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির চুক্তি পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রয়োজনে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকেও আমদানির ব্যবস্থা করা হবে—মুখ্য লক্ষ্য দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। তবে আমদানির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অতিরিক্ত চাপ না পড়া নিশ্চিত করাও জরুরি; কারণ রিজার্ভের ওপরই খাদ্য নিরাপত্তা ও সার আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত নির্ভরশীল। এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজন হলে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ঋণ নেওয়ার মতো বিকল্পও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সংস্থাটি শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদী নয়, মধ্যমেয়াদি সমাধানেও জোর দিচ্ছে—একটি কৌশলগত জ্বালানি রিজার্ভ গড়ে তোলা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে বাজারে স্থিতিশীলতা আসে এবং প্যানিক বায়িংয়ের ঝুঁকি কমে।

সিপিডি আরও সতর্ক করেছে যে, বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে চলতি অর্থবছরেই সরকার প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার শুল্ক রাজস্ব হারাতে পারে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় সাড়ে চার হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে এবং পরবর্তী ৫–১০ বছরে আরও দুই হাজার দুইশত দশ ধরণের পণ্যে শুল্ক ছাড় দেওয়া হতে পারে। এতে শুল্ক রাজস্বে বড় ধরনের ক্ষতি ছাড়াও সরকারের ওপর ক্রয়শর্তের কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। সিপিডি মনে করে, এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব—বিশেষ করে রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের দিক—পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা জরুরি।

সেইসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলমান জটিল পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা—যার জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থা শক্ত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ দরকার। তিনি উল্লেখ করেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে গুরুত্ব বহন করে; এটি সরকারের জন্য নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ। একই সঙ্গে বর্তমান অস্থিরতা মোকাবিলা ও অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার অব্যাহত রাখার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।