দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বাংলাদেশ ও স্পেনের যৌথ পুঁজিতে নির্মিত ‘স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’ গত ৬ জুন থেকে টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু করেছে। উদ্বোধনী চালানে স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালসহ ইউরোপের নানা বাজারে মোট ২০০ কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত ভুট্টা পাঠানো হচ্ছে। চলতি চালানের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ।
কারখানাটি শেলটেক গ্রুপ ও স্পেনভিত্তিক সেলারিও (সেলেরিও) গ্রুপ যৌথভাবে গড়ে তুলেছে। প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে চার হাজার চুক্তিপত্রভিত্তিক কৃষক উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ভুট্টা চাষ করছেন। এই কৃষি উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যবস্তুর বাজারে সম্ভাবনা দেখে তারা এই খাতে পদক্ষেপ নিয়েছেন। সেলারিও গ্রুপ টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বিপণনের দায়িত্বও তারা নেবে। আগামী পাঁচ বছরে পার্বতীপুর কারখানায় উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী সেলারিওর মাধ্যমে রপ্তানি হবে বলে প্রতিষ্ঠান আশাবাদী।
কারখানায় আসা কাঁচা ভুট্টা প্রথমে মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় লাইন দিয়ে ক্যান বা কৌট আকারে প্রক্রিয়াজাত করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয় এবং কনটেইনারে ভরে গন্তব্যস্থলে পাঠানো হয়।
কারখানার নির্মাণ কাজ প্রায় দেড় বছর আগে শুরু হয়। গত বছরের জুনে স্পেন থেকে আনা বিশেষ জাতের ভুট্টার বীজ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক চাষিরা প্রথমবার চাষ শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের কাছে বীজ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে এবং ফসল কেনার শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
প্রথাগতভাবে বাংলাদেশে প্রতিটি ভুট্টার ছড়ার ওজন সাধারণত ২০০–২৫০ গ্রাম হলেও স্পেনের হাইব্রিড বীজে একেক ছড়ার ওজন ৪০০–৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হচ্ছে। বর্তমানে চার হাজার কৃষক এতে যুক্ত হলেও ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কে ৪০ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
ভুট্টার পাশাপাশি পার্বতীপুর কারখানায় আনারস প্রক্রিয়াজাত করা শুরু হয়েছে; টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকা থেকে আনা আনারস সংগ্রহ করে টিনজাত করে রপ্তানির লক্ষ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ফ্রুট ককটেল, শুকনা আনারস, শুকনা আমের পাশাপাশি তাজা আম ও লিচুও রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। তানভীর আহমেদ জানান, কারখানাটি পূর্ণ মাত্রায় চললে বার্ষিক ১৫–১৭ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি সক্ষমতা থাকবে, যা উন্নয়ন করে ২০ কোটি ডলারে উন্নীত করা যাবে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৮ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করছে।
শেলটেক গ্রুপ কেবল কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে নয়, আবাসন ও শিল্পখাতেও বড় বিনিয়োগ করছে। রাজধানীর বনশ্রীতে ৫৩ কাঠা জমির ওপর ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা’ নামে ১৭ তলা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব শপিংমল নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করেছে; প্রায় ২ লাখ বর্গফুট আয়তনের এই প্রজেক্টে ৫৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে এবং এখানে ৩৫০টি দোকান ও ফুড কোর্টসহ নানান সুবিধা থাকবে।
জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে যৌথ উদ্যোগে ২১টি আবাসিক প্রকল্পে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ব্লেন্ডেড সুতার উৎপাদন বাড়াতে এনভয় টেক্সটাইলস প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং সিলেটে অ্যাব্রেসিভ পেপার উৎপাদনকারী গ্রাইন্ডটেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় কার্বন নিঃসরণ কমাতে নিজেদের বিভিন্ন কারখানায় ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বর্তমানে শেলটেক ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের অধীনে ৩১টি প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং সেখানে প্রায় ১৭ হাজার কর্মী কর্মরত। গ্রুপটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মী সংখ্যা বাড়িয়ে ৫৮ হাজার এবং বার্ষিক লেনদেন ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা।
তানভীর আহমেদ জানান, মোট প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগের কাজ এক থেকে দেড় বছর ধরে শুরু করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং আমদানির বিকল্প দেশীয়ভাবে তৈরি করা—সেই কৌশ্য ও ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন বিবেচনায় বিনিয়োগগুলো করা হয়েছে, ফলে ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।














