ঢাকা | রবিবার | ২৮শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৩ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ছবি সহ এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব

নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নবায়ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যে এনআইডির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হবে—সেগুলো নবায়ন করা অনিবার্য করলে পরিচয় যাচাই আরও নির্ভরযোগ্য হবে।

আইন ও বিধিমালায় এনআইডি নবায়নের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ইসি বলছে, দীর্ঘ ১৫ বছরে অনেকের চেহারা বদলে যায়; কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের চেহারায় পরিবর্তন আনেন, কেউ সার্জারির মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করেন। আর সময়ের সঙ্গে আঙুলের ছাপের কোয়ালিটি কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বায়োমেট্রিক যাচাই জটিল হয়—এসবকেই টেকসইভাবে মোকাবিলা করার জন্য নবায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

আইন ও বিধিমালা কী বলে

জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন, ২০১০-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী কোনো নাগরিককে প্রদত্ত এনআইডির মেয়াদ প্রদানের তারিখ থেকে ১৫ বছর। একই আইন ও বিধি অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে বা পরে নাগরিককে নির্ধারিত পদ্ধতি ও ফি প্রদান সাপেক্ষে কমিশনের কাছে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হয়।

বিধিমালায় বলা আছে, এনআইডি নবায়নের জন্য প্রত্যেক নাগরিক বা ক্ষেত্রমতো তার আইনানুগ অভিভাবককে ফরম-৫ অনুযায়ী সরাসরি কমিশন কার্যালয়ে অথবা কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আবেদন সরাসরি হলে ফি পরিশোধের রশিদ কপি সংযুক্ত করে ‘জরুরি’ বা ‘সাধারণ’ হিসেবে দাখিল করতে হবে; অনলাইনে হলে রশিদের স্ক্যানকৃত কপি ইলেকট্রনিকভাবে দাখিল করতে হবে।

প্রক্রিয়া ও সময়সীমা

বিধি অনুযায়ী ‘জরুরি’ আবেদন কমিশনে করা হয় এবং ‘সাধারণ’ আবেদন স্থানীয় কার্যালয়ে। আবেদনপত্র পেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদন ফরমের অংশ ‘ক’ স্বাক্ষর করে আবেদনকারীকে ফেরত দেবেন বা অনলাইনে হলে মোবাইল/ইমেইলে তা পাঠাবেন। যদি আবেদনপত্রে কোনো ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থাকে, কর্মকর্তা তা অংশ ‘ক’-এ উল্লেখ করে আবেদনকারীকে ফেরত দেবেন যাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পুনরায় দাখিল করা যায়।

আবেদন গ্রহণ ও তফসিল অনুযায়ী কর্মকর্তারা বায়োমেট্রিক ফিচার নেবেন—এর জন্য আবেদনকারীকে অংশ ‘ক’-এ নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত হতে হবে। বিধিমালায় বায়োমেট্রিক ফিচারের মধ্যে আঙুলের ছাপ, হাতের ছাপ, তালুর ছাপ, চোখের আইরিশ, মুখাবয়ব, ডিএনএ, স্বাক্ষর ও কণ্ঠস্বর উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে শুধু আঙুলের ছাপ ও আইরিশ নেওয়া হচ্ছে। বায়োমেট্রিক সংগ্রহ সেরে কর্মকর্তা আবেদন ফরমের অংশ ‘খ’ স্বাক্ষর করে আবেদনকারীকে দেবেন। এরপর কমিশন পূর্বনির্ধারিত তারিখে পুরাতন এনআইডি ফেরত নিয়ে একই নম্বরে নতুন এনআইডি জারি করবে (ফরম-২ বা ফরম-৪ অনুযায়ী)।

বিধি অনুযায়ী জরুরি আবেদনের প্রক্রিয়া ৭ দিনের মধ্যে এবং সাধারণ আবেদনের জন্য ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারিত আছে। নবায়ন ফি হিসেবে জরুরি আবেদনের জন্য ১৫০ টাকা এবং সাধারণ আবেদনের জন্য ১০০ টাকা ধার্য করা হয়েছে।

হারানো/নষ্ট এনআইডি ও ফি ব্যবধান

বর্তমানে সাধারণত মানুষ এনআইডি হারানো বা নষ্ট হলে নতুন এনআইডির জন্য আবেদন করে, যেখানে ফি নবায়নের তুলনায় বেশি। বিধিমালা অনুযায়ী প্রথমবার হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে আবেদন করলে সাধারণ ফি ২০০ টাকা, জরুরি ৩০০ টাকা; দ্বিতীয়বার সাধারণ ৩০০ ও জরুরি ৫০০ টাকা; পরের যে কোনোবার সাধারণ ৫০০ ও জরুরি ১০০০ টাকা ধার্য রয়েছে। ইসির লক্ষ্য হচ্ছে নবায়ন বাধ্যতামূলক করলে ছবি, আঙুলের ছাপ ও আইরিশের মতো তথ্য সময়ে সময়ে হালনাগাদ থাকবে, ফলে পরিচয় যাচাই সহজ হবে এবং খরচও তুলনামূলকভাবে কমে যাবে।

ইসি ও এনআইডি কার্যালয়ের প্রতিক্রিয়া

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নবায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হচ্ছে না —তবে কেউ চাইলে যে কোনো সময় নবায়ন করতে পারবেন। ১৫ বছরের মধ্যে হওয়া পরিবর্তনগুলোকে কেন্দ্র করে কারসাজির সুযোগ আছে বলে উঠে এলে নবায়ন বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে আমরা ভাবছি ও আলোচনা চলছে। ইসি কর্মকর্তা বলছেন, বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং তারা শক্তভাবে এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করতে চান। ফি করে করা হবে না কি না—এও বিবেচ্য বিষয়।

এনআইডি মহাপরিচালক এএইচএম আনোয়ার পাশা জানান, বিষয়টি এখনও পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে এবং সিদ্ধান্ত কী হবে তা দেখার অপেক্ষা।

সংক্ষেপে, ভোটার সুরক্ষা ও পরিচয় যাচাই আরও নির্ভরযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশন এনআইডি নবায়নকে বাধ্যতামূলক করার কথা ভাবছে—বিশেষ করে মেয়াদ শেষ হওয়া ১৫ বছরপূর্তির পরে। প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে নাগরিকদের নিয়মিতভাবে ছবি ও বায়োমেট্রিক হালনাগাদ করতে হবে, যা ভবিষ্যতে পরিচয় জালিয়াতি প্রতিহত করবে।