ঢাকা | শনিবার | ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৮ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

১৫ বছর ধরে শিকলবন্দী ২৪ বছরের মিতু — দ্রুত চিকিৎসা ও সহায়তার আবেদন

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার প্রসাদপুর গ্রামের মোড়ল পাড়ায় মানবিকতার এক মর্মন্তুদ চিত্র সামনে এসেছে। ২৪ বছরের মিতু নামের এক তরুণী দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে পায়ে লোহার শিকল ও বেড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, মিতু ছোটবেলা থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। পরিবার মনে করেছে তিনি হঠাৎ ঘুরে বেড়াতে গেলে বিপদ ঘটতে পারে, তাই নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তাকে লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শিকল মিতুর দেহ ও জীবনের এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সার্জিকালভাবে পরিমাপ করা না গেলেও স্থানীয়রা বলেন মিতুর পায়ে বাঁধা শিকল ও বেড়ির ওজন প্রায় ১০ কেজির মতো, যা তার স্বাভাবিক চলাফেরা প্রায় בלתיসাধ্য করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে শিকলবন্দী থাকায় তার দৈনন্দিন কাজকর্ম, স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা ও জীবনযাপন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মিতুর মা হাসিনা বেগম জানান, “মেয়ে অনেক সময় এদিক-সেদিক ঘোরে। এটা থেকেই আমরা ভয়ে তাকে বেঁধে রাখি। চিকিৎসার জন্য টাকা নেই, অভাবের কারণে যত্নটা করতে পারি না।” মিতুর বাবা আবুল মোড়ল প্রায় আট বছর আগে মারা যান। পরিবারে মিতু ছাড়াও দুই বোন ও এক ভাই আছেন। বড় বোন বিবাহিত, ছোট ভাই ঢাকায় একটি বেকারিতে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। পুরো পরিবারের মাসিক আয় মাত্র আট হাজার টাকা — যা দিয়ে চিকিৎসা কিংবা অতিরিক্ত খরচ চালানো সম্ভব হয়নি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দারিদ্র্য ও অসহায়তার কারণে মিতুর উন্নত চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত করা যায়নি। স্থানীয়রা এই কাণ্ডকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন; কেউ এটিকে নিরাপত্তার প্রয়োজনে নেয়া পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করলেও অনেকে এটিকে অমানবিক বলে সমালোচনা করেছেন।

তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. খালিদ হাসান নবন (নয়ন) বলেছেন, “সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হলে মিতুর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

তালা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান জানান, সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা মিতুকে দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে দেবার ব্যবস্থা করব এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত সহায়তার কার্যক্রম গ্রহণ করব।”

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতারও দৈনিক বাংলা প্রতিবেদককে জানান, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন এবং তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিষয়টি তদন্তকারী নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনার প্রকৃতি দেখার পর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও ধাপ গ্রহণ করা হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল এবং মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মিতুর মতো মানুষের দ্রুত চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা না করলে তাদের জীবনমান উন্নত করা যাবে না। তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ ও মিতুকে লঘু-মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসার সুযোগ দেয়ার দাবি জানান।

এখন প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিবারের আর্থিক সহায়তা যেন মিতুকে শিকলবন্দী জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।