জাতীয় সংসদ সোমবারের অধিবেশনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী সহ কয়েকটি বিল দ্রুতভাবে পাস করে, যার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো এখন আইনি স্বীকৃতি পেল। সংসদে কণ্ঠভোটে গৃহীত ওই বিলের মূলে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং তাদের প্রচার-প্রচারণা বন্ধের বিধান রাখা হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহালই থাকছে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব সংশোধনী বিল উত্থাপন করেন এবং তা অবিলম্বে বিবেচনায় এনে কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। একই দিনে আরও ছয়টি বিলও পাশ হয়; সেগুলো হলো — জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা আইন, ২০২৬, প্রোটেকশন অ্যান্ড কনসারভেশন অফ ফিস (সংশোধন) আইন, ২০২৬, শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি জামালপুর (সংশোধন) আইন, ২০২৬, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাষণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এবং জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯ রহিতকরণ বিল।
নতুন সার সংক্ষেপে বলা হয়েছে যে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সত্তাকে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ থাকলেও সত্তার ‘সকল কার্যক্রম’ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান ছিল না। তাই ১৮ ও ২০ ধারায় সংশোধনী এনে বলা হয়েছে— কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি তাদের যাবতীয় কার্যক্রমই বন্ধ করা যাবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাদের অর্থসম্পদ, লেনদেন ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিধানটি যুক্ত হলে ওই সত্তা বা পক্ষের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রেস বিবৃতি, পত্রিকা, অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা, মিছিল, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন বা জনসমক্ষে ভাষণ দেয়া—এসবই নিষিদ্ধ ধরা হবে।
বিলে উল্লেখ আছে এই আইন ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে বলে গণ্য হবে এবং একইসাথে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে বলবৎ হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত বিল অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পুরনো দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা-অভিযোগগুলো নির্দিষ্ট বিধান অনুসারে প্রত্যাহার করা হবে, তবে নতুন করে ভারী অপরাধের অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়া চালানো যাবে।
এই ধারা সম্পর্কিত যুক্তি উপস্থাপন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সংশোধনীর লক্ষ্য একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে কার্যত নিষিদ্ধ করা এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তিনি বললেন, আগের আইনে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট নয় এবং সংশোধনীর ফলে আইন প্রয়োগে গ্যাপ পূরণ হবে। স্পিকারও এই বিলের পক্ষে মন্তব্য করে বলেন সংশোধনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও তাদের নিবন্ধন স্থগিত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে ট্রাইব্যুনাল-সম্পর্কিত আইনেও সংশোধনী আনা হয়েছে।
বিলে আরও আলোচিত একটি বিধান ছিল—‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯’ রদ করে শেখ পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা বাতিল করা। ২০০৯ সালে গেজেট আকারে জারি করা ওই আইনের অধীন বিশেষ নিরাপত্তা ও সুবিধাদি পরে বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চালু ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ওই রহিতকরণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, যা এখন স্থায়ী বিলের মাধ্যমে সংবিধানিক স্বীকৃতি পেল।
পাশাপাশি ‘শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি জামালপুর (সংশোধন) বিল’ পাসের প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নাম থেকে ‘শেখ হাসিনা’ অংশটি অপসারণের প্রস্তাবও অনুমোদন পায়। অন্যান্য বিলগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের দ্বারা উত্থাপিত হয় এবং বিশেষ কোনো সংশোধনী না থাকায় সেগুলো সরাসরি পাস হয়ে যায়।
পাসের আগে বিরোধীদলের নেতা আক্ষেপ করেছেন যে বিলের তুলনামূলক বিবরণী তারা মাত্র কয়েক মিনিট আগে হাতে পেয়েছেন এবং সংবেদনশীল বিষয়ে পর্যাপ্ত সময় রেখে আলোচনা করার অনুরোধ জানান। তবে স্পিকার বলেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপত্তি করা হয়নি, তাই ওই পর্যায়ে বিলটি কার্যত চূড়ান্ত রূপে উপস্থাপিত ছিল এবং এখন আর আপত্তি করার সুযোগ সংগত নয়।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিস্তৃত ছাত্র-জনতা আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ঘটনাবলী ঘটে; তাতে সরকারের পরিবর্তন, বিচার-প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে সংসদীয় ও আইনি সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তীতে এসেছে। ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সমর্থক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; এখন তৎকালীন অধ্যাদেশগুলোই সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিল আকারে আইনে রূপান্তর করা হলো।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সংশোধনীগুলো সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে, আর আইনজীবীরা আশ্বস্ত করছেন যে সরকারি কর্মকর্তা ও আইন প্রয়োগকারীদের উচিত যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে, সাবধানতার সঙ্গে বিধান প্রয়োগ করা—তাই যাতে বেআইনিভাবে নাগরিক অধিকার বা মতপ্রকাশ দমন না ঘটে।












