ঢাকা | মঙ্গলবার | ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

সীমান্ত বাণিজ্য সচল করতে টেকনাফ স্থলবন্দর দ্রুত চালুর উদ্যোগ

বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার টেকনাফ স্থলবন্দর প্রায় এক বছর ধরে আপৎকালীন পরিস্থিতির কারণে কার্যত অচল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সীমান্ত নিরাপত্তার ঝুঁকির ফলে আমদানি-রফতানি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থবির হয়ে ছিল। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বন্দরটি পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান সোমবার টেকনাফ স্থলবন্দর এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেরুনতলী এলাকায় নাফ নদীর তীরবর্তী বন্দরে পৌঁছেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন্দরসম্পৃক্তদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি বন্দর এলাকার গুদামঘর, অবকাঠামো ও সামগ্রিক কার্যক্রম ব্রিফ করে দেখে নেন।

পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, বন্দর পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ব্যবসায়ী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, সিএন্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস ও এনবিআরসহ সকল পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। জনগণের চাহিদা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্দর সচল করার পদক্ষেপ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের সমন্বয়ে সীমান্ত বাণিজ্য স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে—এই বার্তাও দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলছেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হওয়ায় বন্দরকেন্দ্রিক কাজে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। পোর্ট অপারেটর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই রোহিঙ্গাদের বন্দরসংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্ত হতে দেওয়া হবে না; এখানে কাজ করতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক হতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র থাকা বাধ্যতামূলক হবে। অনুপ্রবেশ বা অবৈধ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মুহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেন, বন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যক্রম দীর্ঘদিন সীমিত ছিল। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করে আবারও পণ্য আমদানি-রফতানি সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্দরটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। সরকার গত অর্থবছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে ধরা হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে— ২০২২-২৩ অর্থবছরে টেকনাফ স্থলবন্দর থেকে প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৮০৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছিল; কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব মাত্র প্রায় ১৩০ কোটি টাকায় নামেছে।

টেকনাফ সি অ্যান্ড এফ অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ওমর ফারুক বলছেন, বন্দর দ্রুত চালু করার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা এক বছরে জমে থাকা লোকসান দ্রুত কাটিয়ে ওঠার আশায় অপেক্ষা করছেন।

বণিক ও প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘর্ষ ও কিছু এলাকার আরাকান শক্তিদের নিয়ন্ত্রণের কারণে সীমান্ত এলাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। গত বছরের এপ্রিল মাসে কিছু পণ্যবাহী জাহাজ থেকে চাঁদাদাবির ঘটনা ঘটার পরে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

সরকার অনুভব করছে—নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে দ্রুত বন্দর সচল করা প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে কবে থেকে পূর্ণমাত্রায় বন্দর চালু হবে সে সম্পর্কে চূড়ান্ত সময়সূচি প্রকাশিত হলে তা জনগণের কাছে জানানো হবে।