ঢাকা | মঙ্গলবার | ৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বাড়ছে বেকারত্ব

আধুনিক প্রযুক্তি দেশে দ্রুত প্রবেশ করছে—অফিস, আদালত, মাঠে সবখানে যান্ত্রিকতা দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সেবার মান বাড়ালেও এক দিক থেকে সেটা কর্মসংস্থান ক্ষুন্ন করে দিচ্ছে। যেখানে মেশিন-ক্যাপাসিটি আসে, সেখানে অনেক রূপে মানুষের কাজ কমে যাচ্ছে বা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ফলে যারা নতুন দক্ষতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না তারা চাকরি হারাচ্ছে এবং প্রতিদিনই বেশি মানুষ বেকারত্বের শিকার হচ্ছে।

স্থানীয় শ্রমিক আওলাদ হোসেন বলেন, আগে রাস্তা-বেড়িবাঁধ, মাটি খননের মতো কাজে অনেক মানুষ মিলে দিনভর কাজ করত; এখন এক্সকেভেটর হাতে এলে সেই কাজ অনেক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে হয়ে যায়, ফলে শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছে। কৃষিজীবী আক্তার হোসেন বলেন, আগে বোরো মৌসুমে বহু মানুষ ধান কাটায় নিযুক্ত থাকত, কিন্তু মেশিনে ধান কাটা শুরু হলে সেসব শ্রমিকের গোলযোগ বেড়ে যায়—মৌসুমে তাদের আয়ের রাস্তা সংকুচিত হয়ে গেছে।

বিএনপি নেতা ও শিল্পপতি কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, প্রযুক্তি বাড়লেই স্বাভাবিকভাবে কিছু কর্মসংস্থান কমে যায়—মানুষের জায়গায় মেশিনের দখল বাড়ে। যারা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তারা টিকে থাকবে। অফিসেও দেখা যায় কম্পিউটারাইজড প্রোগ্রাম বহু মানুষের কাজ করছে; এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

আনুমানিক পরিকল্পনামূলক প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তার সাথে কিছু সংখ্যাগত তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্যমতে বাংলাদেশের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিত বেকারের হার অত্যন্ত বেশি—প্রতি ১০০ জন স্নাতক ধারীদের মধ্যে ৪৭ জন বেকার। দেশি জরিপ অনুযায়ী দেশের কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনুযায়ী বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। এসব তথ্যই ইঙ্গিত করে, যদি দ্রুত ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে বহু মানুষ পিছিয়ে পড়বে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার না করে থাকা সম্ভব নয়, তবুও প্রযুক্তি প্রয়োগ এমনভাবে করা উচিত যে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান হ্রাস না পায়। তিনি অভিভাবকীয় কয়েকটি পরামর্শ দিলেন—ভোকেশনাল কোর্স চালু করা, যেখানে কাজ হয় সেখানেই শ্রমিকদের সংগঠিত করা যাতে তারা তাদের সমস্যা কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে পারে, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করে সমান মজুরি নিশ্চিত করা, শিশুশ্রম কমানো এবং নির্ধারিত কাজে দক্ষদের অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যবস্থা করা। এছাড়া যারা নতুন কাজে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানালেন।

রূপগঞ্জের বেকার কল্যাণ সংস্থার সভাপতি নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, প্রযুক্তি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। তবে প্রযুক্তি এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে যাতে মানুষের কাজের সুযোগ ন্যূনতম ক্ষতিগ্রস্থ হয়—একটি কাজ কমলে অন্যদিকে কাজ বাড়ানোর ব্যবস্থা হতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে প্রযুক্তি কম মানুষ দিয়ে বেশি উৎপাদন করতে সহায়তা করে; কিন্তু আমাদের ততভাবে ক্ষুদ্র জনসংখ্যা নয়। যদি চাহিদা কমে যায়, বিশাল জনসংখ্যার রোজগার কীভাবে যাবে, সেটাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিস্থিতি সামলাতে নীতি নির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন—প্রযুক্তি গ্রহণের সাথে সাথে দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার, এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য কাজ সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করা। অন্যথায় প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার অনেক মানুষের জন্য সুযোগের বদলে সমস্যাই হয়ে দাঁড়াবে।