ঢাকা | শনিবার | ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৬ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর, শাস্তির বিধান যোগের প্রস্তুতি

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’গুলোকে আইনে রূপান্তর করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় একটি অধ্যাদেশ—আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের নির্দেশবল—আইনে পরিণত করলে সেখানে শাস্তির বিধানও যোগ করা হবে। ফলে নির্বাহী আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকবে এবং আইন হলে তা অমান্য করার ওপর নির্দিষ্ট সাজা আরোপ করা যাবে।

১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনে (গত ১৩ মার্চ) গঠিত ১৪ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কমিটি ওই অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে। কমিটি গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জানায়, ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনও পরিবর্তন ছাড়াই আইনে পরিণত করার সুপারিশ করা হয়েছে, ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, ১৬টি অধ্যাদেশ এই মুহূর্তে উত্থাপন না করার পরামর্শ রয়েছে এবং চারটি অধ্যাদেশ রহিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।

সংশোধনের তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ হচ্ছে ২০২৫ সালের ১১ মে জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’। ওই অধ্যাদেশে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ও ২০ ধারায় পরিবর্তন করে গত বছরই আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একই ধারায় ২০২৪ সালের অক্টোবরেও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

গত বছরের ৯ মে রাতে এনসিপি নেতারা তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনার কাছে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে পরে জামায়াতে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন দল এতে যোগ দেয়। ১১ মে রাতে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি ধারা সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়েছিল। একই দিন সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি দল নিষিদ্ধ করেনি—বরং কার্যক্রম নিষিদ্ধের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তথ্যমতে, ওই অধ্যাদেশের আওতায় নিষিদ্ধ সংগঠন মিছিল-সমাবেশ, কার্যালয় খোলা, ব্যাংক হিসাব ব্যবহার, পোস্টার-ব্যানার প্রচারণা, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, গণমাধ্যমে বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার ও সংবাদ সম্মেলনসহ নানা কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারবে না।

তবে অধ্যাদেশটিতে কার্যক্রম পরিচালনার বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তি আরোপ করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। সম্প্রতি কমিটির ও মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এসব শাস্তি বিধান সংযুক্ত করার সুপারিশ এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে অধ্যাদেশে এ ধরনের শাস্তি নেই; তাই শাস্তির বিধান যোগ করা যেতে পারে। সরকারি সূত্র বলছে, নিষিদ্ধ সংগঠনের নির্দেশভঙ্গের ক্ষেত্রে আইনের ১৬ ধারায় থাকা সাজার বিধান—যেখানে চার থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ডের কথা বলা আছে—প্রযোজ্য রাখা হতে পারে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগ এখনও দলগতভাবে বিস্তৃত বিবৃতি দিতে চানি, তবে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও প্রাক্তন মন্ত্রী আবদুর রহমান বলেছেন, ‘‘যা করার জনগণই করবে।’’ তিনি জানিয়েছেন, যেখানে প্রয়োজন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যেখানে প্রতিবাদের প্রয়োজন দেখা দেবে সেখানে তারা প্রতিবাদও করবে।

সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার প্রশ্নে আবদুর রহমান বলেন, প্রয়োজন হলে তারা আদালতের পথও নেবে। সূত্রগুলোর অভিমত অনুযায়ী, অধ্যাদেশে শাস্তির বিধান যোগ হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি পরিচালনায় আরও কড়াকড়ি ও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

সংক্ষেপে, বিশেষ কমিটির সুপারিশের আলোকে বিএনপি সরকার বেশিরভাগ অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে পাসের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে; যেখানে প্রয়োজন সংশোধন করে শাস্তির বিধান যোগ করা হবে—আর সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ যদি আইনে রূপান্তরিত ও শাস্তিসহ কার্যকর করা হয়, তা হলে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর কার্যক্রম কেবল নিষিদ্ধ থাকাই নয়, সেই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের জন্য স্পষ্ট জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধানও কার্যকর থাকবে।