ঢাকা | শনিবার | ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৬ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

রপ্তানিতে টানা আট মাসের পতন — মার্চে বড় ধস

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে তীব্র মন্দা চলছে; চলতি অর্থবছরের মধ্যে গত মার্চ মাসে রপ্তানি আয় এক মাসে সবচেয়ে বড় হারে কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)–র হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, টানা আট মাস ধরে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে — দেশের বাণিজ্য ইতিহাসে এ ধরনের স্থায়ী পতন আগে দেখা যায়নি এবং এটি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।

ইপিবির ডেটা অনুযায়ী, গত মার্চে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৪৮ কোটি মার্কিন ডলার; যেখানে আগের বছরের একই মাসে আয় ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই রপ্তানি আয় কমেছে ৭৭ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার সমমান। সাধারণত মাসিক রপ্তানি আয় সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে দাঁড়ায়; কিন্তু মার্চে সেই আয় ব্যাপকভাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে এই অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩,৫৩৯ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে থেকে ৪.৮৫ শতাংশ কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নজিরবিহীন ধসের পেছনে আছেন both বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ কারণ। প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ, যা গত বছরের আগস্ট থেকে কার্যকর। এ শুল্কের প্রভাব মার্কিন বাজারে চাহিদা ও প্রতিযোগিতাচক্রে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সস্তা পণ্য আগ্রাসীভাবে প্রবেশ করায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে।

সেকেন্ডারি কারণ হিসেবে মার্চে উদযাপিত ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কারখানা গড়পড়তা ১০ দিন বন্ধ থাকার ফলে উৎপাদন সময়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে — এটি রপ্তানিতে তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং জ্বালানি-মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা ও লজিস্টিক জটিলতা রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৈরি পোশাক—the রপ্তানি খাতের প্রধান অর্জক—এর অবস্থা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ধরা পড়েছে। মার্চে এককভাবে পোশাক রপ্তানি ১৯.৩৫ শতাংশ কমে ২৭৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে; যেখানে গত বছরের মার্চে এটি ছিল ৩৪৫ কোটি ডলার। বিজিএমইএ–র পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিন মন্তব্য করেছেন, মার্কিন শুল্কায়ন, প্রতিযোগী দেশগুলোর চাপ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মিলিয়ে খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন জ্বালানি ও লজিস্টিক ব্যয়ের বৃদ্ধিও দীর্ঘমেয়াদে খাতের সক্ষমতাকে বিষম করে তুলছে।

পোশাক ছাড়াও অন্যান্য বড় খাতগুলোও মন্দার সম্মুখীন। ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, চলতি ৯ মাসে হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি ২১ শতাংশ কমেছে, ওষুধ রপ্তানি ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৭ শতাংশ এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে তীব্র পতন এসেছে তাজা সবজি রপ্তানিতে — প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে।

তবে কিছু খাতে ইতিবাচক সাইনও দেখা গেছে। প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি আয় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, হিমায়িত মাছের রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়েছে, এবং কাঁকড়া রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বাড়ার ফলে খাতে আংশিক স্বস্তি এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংকট থেকে বের হতে বাজার বহুমুখীকরণ, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং বহুমাত্রিক বাণিজ্য কৌশল জরুরি। পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না গেলে এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ফেরাতে না পারলে দ্রুত মনোরঞ্জন আশা করা কঠিন। সরকারের নীতিগত সহায়তা, খাতে প্রণোদনা ও লজিস্টিক ব্যবস্থার অগ্রাধিকার প্রদান ছাড়া রপ্তানি খাতের পুনরুদ্ধার সময়সাপেক্ষ হবে বলে তারা মনে করছেন।