ঢাকা | শুক্রবার | ৩রা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৫ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি: জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও ডলারের চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও বিশ্ববাজারে অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশসহ অনেক দেশের অর্থনীতিকে ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়া, তীব্র মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের সংকট মিলেই আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে; ফলে ঋণচাপ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার মূলত কর ফাঁকি রোধ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার অর্থ মুদ্রার মুদ্রণ করে বাজার সচল করার পথে চলবে না।

জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়েছে, যা দেশে তেলের আমদানি খরচ বাড়াতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব হচ্ছে উৎপাদন ও পরিবহনে খরচ বৃদ্ধি, যা শেষপর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করতে পারে।

অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকট: ডলারের সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়ন আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। সামষ্টিক এই চাপ বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিবেশে নেতিবাচক সিগন্যাল দিচ্ছে।

রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে ঝুঁকি: যদি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, সেখানে কর্মরত প্রবাসীদের আয় ও রেমিট্যান্স কমতে পারে। সেই সঙ্গে রপ্তানিবাজারও অনিশ্চিততায় পড়ার আশঙ্কা আছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আগমনকে আরও অনিশ্চিত করবে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া ও নীতি: মন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার এখন কর ফাঁকি রোধ ও রাজস্বসংগ্রহ বাড়াতে গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি স্থায়িত্ব ফেরানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে ব্যবসায়ীরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারে।

বাজেট অগ্রাধিকার: আগামী বাজেটে রাজস্ব আহরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাজেট পরিকল্পনায় নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর রেখে জনবান্ধব নীতির প্রতিফলন ঘটানো হবে। বিশেষ করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো নিরাপত্তা উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা: তৈরি পোশাকে অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে রপ্তানি খাত বহুমুখীকরণ করা হবে এবং নতুন সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধার মাধ্যমে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি জাপান ও জার্মানির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতাও জোরদার করার চেষ্টা চলছে।

পুঁজিবাজার সংস্কার ও বিনিয়োগকারীর আস্থা: পূর্বে ঘন ঘন নীতিমালা বদলের ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিভ্রান্তিমূলক সংকেত পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি সংশোধন করতে সরকার নীতিমালার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বড় ধরনের ‘ডিরেগুলেশন’ বা নিয়মশিথিলতার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, যাতে আর্থিক ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়।

এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গ: মন্ত্রী জানিয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় আছে। উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পেছানোর অনুরোধ পাঠানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি চিঠি জাতিসংঘে পাঠাবেন; বিষয়টি এখন পর্যালোচনার ধাপে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

সংক্ষেপে, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার কর ব্যবস্থা দৃঢ় করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রাখা ও রপ্তানি ও বৈদেশিক সহযোগিতা বাড়ার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে। তবে ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও নীতিনির্ধারকের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ পথকে নির্ধারণ করবে।